বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পাঁচ দফা আহ্বান শেখ হাসিনার, ইউনুস অপসারণ দাবি

দিল্লি, ২৫ জানুয়ারি :- অপসারিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। তিনি মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অপসারণ এবং গত বছর তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পেছনের ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানান। বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদীয় নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার একদিন পরই তিনি এই বক্তব্য রাখেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা শুক্রবার রাজধানীর মর্যাদাপূর্ণ ফরেন করেসপন্ডেন্টস’ ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (FCC)-তে আয়োজিত এক মিডিয়া ইন্টারঅ্যাকশন অনুষ্ঠানে রেকর্ড করা বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য রাখেন। তার সমর্থকদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন অনলাইনে এতে অংশ নেন। বাংলা ও ইংরেজিতে দেওয়া প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্যে শেখ হাসিনা বর্তমান ইউনুস-নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, এই সরকার দেশের ভেতরে বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা ও দুর্নীতি বাড়িয়েছে। তিনি জনগণকে হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

পাঁচ দফা কর্মসূচির প্রথম দফায় শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্র ফেরাতে হলে আগে ইউনুস সরকারকে সরাতে হবে। তাঁর মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয় দফায় তিনি রাস্তায় চলমান সহিংসতা বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানান, যাতে নাগরিক পরিষেবা স্বাভাবিকভাবে চলে এবং অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

তৃতীয় দফায় শেখ হাসিনা ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও সমাজের দুর্বল অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিককে নিজের এলাকায় নিরাপদ বোধ করতে হবে। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারত সরকারের উদ্বেগের কথাও উঠে আসে।

চতুর্থ দফায় তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনকে ব্যবহার করে সাংবাদিক এবং আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ভয় দেখানো ও কারাবন্দি করা হচ্ছে। তিনি বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরানোর আহ্বান জানান।

শেষ দফায় শেখ হাসিনা জাতিসংঘের কাছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। তাঁর মতে, সত্য উদ্ঘাটন হলে জাতীয় পুনর্মিলন সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশ আজ চরমপন্থী শক্তি ও বিদেশি স্বার্থের হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি জনগণের প্রতি সংবিধান রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানান।

এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দেশজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
পরবর্তী সময়ে, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ আন্দোলন দমনের ঘটনায় তার ভূমিকার জন্য ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ইউনুস-নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ এবং তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকেও নিষিদ্ধ করেছে, যা নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে।

শুক্রবারের এই বক্তব্য ছিল ভারতে আসার পর শেখ হাসিনার প্রথম কোনো সম্মিলিত মিডিয়া মঞ্চের বক্তব্য, যদিও নির্বাচনকালে তিনি দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের উদ্দেশে একাধিক রেকর্ড করা বার্তা দিয়েছেন।