লোক সংহতি দিবসে সুরে সুরে ভাসল শিলচর

জনসংযোগ, শিলচর, ১৩ সেপ্টেম্বর :- বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই শিলচরের বাতাসে মিশে ছিল লোকসঙ্গীতের এক অন্যরকম আবহ। স্থায়ী লাউডস্পিকারে ভেসে আসছিল কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের অমর সুর, কখনও ভাটিয়ালি, কখনও ভাওয়াইয়া, কখনও আবার ছড়া গানের ঝংকার। সেই সুর যেন মানুষকে টেনে নিয়ে গেল অতীতে, যেখানে গানই ছিল সংযোগের সেতু, গানই ছিল মানুষের মনের ভাষা।

১১সেপ্টেম্বর এই দিনটি শুধুই একটি তারিখ নয়, শিলচরের গর্বের দিন। কারণ, ১৯৭০-এর ১১ই সেপ্টেম্বর এই শহরেরই কোলে জন্মেছিলেন এক লোকসঙ্গীতের ধ্রুবতারা, প্রয়াত কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য। সেই জন্মদিনেই জেলা প্রশাসন, তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয় শিলচর এবং সাংস্কৃতিক পরিক্রমা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পালিত হল “লোক সংহতি দিবস”।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় শিলচরের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের কার্যালয় প্রাঙ্গণে শিল্পীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে। একে একে এগিয়ে আসেন পরিবার-পরিজন, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা। সহকারী আয়ুক্ত তথা শাখা আধিকারিক জেলা সাংস্কৃতিক পরিক্রমা বিভাগ এবং ভারপ্রাপ্ত উপ সঞ্চালক তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয়, শিলচর শ্রীমতী দীপা দাস, এ.সি.এস. শিল্পীর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আবেগভরা কণ্ঠে বলেন “কালিকা প্রসাদ শুধু গান করেননি, তিনি আমাদের লোকঐতিহ্যকে এক নতুন মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠে লোকগান পেয়েছিল জীবনের ভাষা, মানুষের আনন্দ-বেদনার রূপ। তাঁর সৃষ্টির আলো আগামী প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে যাবে।”

শিল্পীর ভগ্নীপতি, শিলচরের অধরচাঁদ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সমর বিজয় চক্রবর্তী এই উপলক্ষে কালিকা প্রসাদের জীবনের অজানা কাহিনী শোনান। তিনি বলেন , “শিলচরের ছোট্ট শহর থেকে শুরু করে কলকাতার মতো মহানগরীতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথ সহজ ছিল না। কিন্তু কালিকা হাল ছাড়েননি। তিনি লোকগানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাঁর গবেষণা, তাঁর সাধনাই ‘দোহার’ নামের দলকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নিয়ে গিয়েছিল। আজ ভারত থেকে বাংলাদেশ, লন্ডন থেকে আমেরিকা,যেখানেই বাঙালি, সেখানেই বাজে কালিকার সুর।”

শুধুই বক্তৃতা নয়, ছিল হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বরাক উপত্যকার খ্যাতনামা শিল্পীরা পরিবেশন করলেন কালিকা প্রসাদের অমর গান,কখনও “ভাটিয়ালি”, কখনও “জারি-সরগম”, কখনও আবার গ্রামের মাঠের দোলার সুর। দর্শক-শ্রোতাদের চোখে জল এনে দিল সেই সঙ্গীত। অনুষ্ঠান আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে যখন প্রয়াত শিল্পীর ভ্রাতুষ্পুত্র সৌমিত্র শঙ্কর চৌধুরী নৃত্য পরিবেশন করেন। নাচের ছন্দ যেন মিশে গেল কালিকার গানের সুরে।

উল্লেখ্য, আসাম সরকার ইতিমধ্যেই ১১ই সেপ্টেম্বরকে “লোক সংহতি দিবস” হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফলে দিনটির তাৎপর্য এখন শুধু শিলচরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সমগ্র আসামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ তারিখ।
এদিন, বরাক উপত্যকার তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয় শিলচর থেকে শহরের স্থায়ী মাইক যোগে প্রয়াত কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের অমর গান বাজিয়ে শোনানো হয়। দিনভর সুরে সুরে ভেসে উঠল স্মৃতির আবহ। এদিন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে শান্তিকুমার ভট্টাচার্য, বিধান লস্কর, মঙ্গলা নাথ, মনোমিতা গোস্বামী, রাজু দেব,সর্বানী ভট্টাচার্য সঙ্গীত পরিবেশন করেন,শিল্পীদের তবলায় যোগ্য সঙ্গত করেন, ভাস্কর দাস, সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন, শিলচরের জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী তথা সংগঠক, জয়দীপ চক্রবর্তী। প্রয়াত শিল্পীর শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে, শিল্পী, প্রশাসনিক আধিকারিক, পরিবার-পরিজন,সকলের হৃদয়ে প্রয়াত কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের স্মৃতিতে একটিই কথা ধ্বনিত হল, “কালিকা নেই, কিন্তু কালিকার গান আমাদের মাঝে বেঁচে আছে। বেঁচে থাকবে আগামী প্রজন্মের কাছে।”