১৪০৫ বঙ্গাব্দে শুরু হয়েছিল সাহিত্যপ্রেমীদের এক অনন্য আড্ডা—‘সাতদিন’। প্রতি রবিবার নিয়মিত বসতো সেই আসর। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অজয় কুমার রায়, সমর চক্রবর্তী, সন্তোষ রায়, সেলিম মুস্তাফা এবং অজিতা চৌধুরী। সাহিত্য, শিল্প ও নন্দনচর্চার গভীর আলোচনাই ছিল এই আড্ডার মূল উদ্দেশ্য। একে অপরের লেখা পাঠ, বিশ্লেষণ এবং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে এই আসর হয়ে উঠেছিল সৃজনশীলতার এক উর্বর ক্ষেত্র। প্রতি সাত দিনে একদিন বসত বলে এর নাম রাখা হয় ‘সাতদিন’। ক্রমশ আড্ডার লেখালেখি এতটাই বিস্তৃত হয়ে উঠল যে একটি পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তাব উঠল। এর ফলেই ১৪০৬ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসে আত্মপ্রকাশ করল ‘জলজ’, যার নামকরণ করেন কবি সন্তোষ রায়। প্রথম সংখ্যাতেই ঘোষণা করা হয় “সাতদিন কোনো আন্দোলনের নাম নয়, এটি এক অনুশীলন, প্রকাশ ও বিশ্লেষণ মাত্র।” শুরুর দিক থেকেই সম্পাদনার দায়িত্ব মূলত কবি সন্তোষ রায়ের হাতে, যা তিনি আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছেন।প্রথম থেকেই এই আড্ডায় যুক্ত হতে থাকেন বিনয় সিনহা, সুতপা রায়, দীপঙ্কর গুপ্ত, অনির্বাণ চক্রবর্তী, তমাল শেখর দে, বিমল শীল, প্রাণজয় সিনহা, অভিজিৎ চক্রবর্তী, বাপ্পা চক্রবর্তী, সিদ্ধার্থ নাথ প্রমুখ। তারপর থেকে অসংখ্য নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যপ্রেমী যুক্ত হয়েছেন এই অনবদ্য ধারার সঙ্গে। বর্তমানে আড্ডার নিয়মিত মুখ অনিমেষ নাথ, দেবাশিস দাস, সুপর্ণা লিলিথ দাস, কৃষ্ণেন্দু অধিকারী, কৌস্তভ ভট্টাচার্য, তৃপ্ত নাথ, পদ্মশ্রী মজুমদার, ভবানী বিশ্বাসসহ অনেকে। ‘জলজ’ মূলত আড্ডার কবিতা প্রকাশের জন্য পরিকল্পিত হলেও ক্রমে আমন্ত্রিত কবিদের লেখাও স্থান পেতে থাকে। শুধু ত্রিপুরা বা উত্তর-পূর্ব ভারত নয়, ভারতের নানা প্রান্ত এবং বাংলাদেশ থেকেও লেখা প্রকাশিত হয়েছে এই কাগজে। শুরুতে চার পৃষ্ঠার পত্রিকা আজ পঞ্চাশ পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেছে। মাসিক থেকে ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, এমনকি বার্ষিক সংখ্যাও প্রকাশিত হয়েছে। শুরুর দিকে কোনো স্কেচ বা অলংকরণ ছিল না, পরে তা অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে ‘জলজ’ হয়ে উঠেছে শিল্পরুচি ও নান্দনিকতায় অনন্য এক লিটল ম্যাগাজিন।সময়ের স্রোতে ‘সাতদিন’ আড্ডার হাত ধরেই জন্ম নেয় ‘সাতদিন প্রকাশনী’, যেখান থেকে ইতোমধ্যেই প্রায় পঞ্চাশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ‘জলজ’ প্রতি বছরই আয়োজন করেছে নানাবিধ অনুষ্ঠান—‘কবিতা-চিত্র প্রদর্শনী’, ‘সান্ধ্য পংক্তিমালা’, কবিতা পাঠ, আলোচনা, সেমিনার ইত্যাদি। ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত হয় ত্রিপুরার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন। ধীরে ধীরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খ্যাতনামা কবি-লেখকদের সম্মাননা প্রদানের ঐতিহ্যও শুরু করে ‘জলজ’। এই তালিকায় আছেন কবি কল্যাণবব্রত চক্রবর্তী, কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, পীযূষ রাউত, নন্দকুমার দেববর্মা, অমিতাভ দেব চৌধুরী, মিলনকান্তি দত্ত প্রমুখ।পত্রিকার প্রচ্ছদ ও অলংকরণের দায়িত্ব শুরু থেকেই সামলাচ্ছেন চিত্রকর কৃষ্ণধন আচার্য। নবীন লেখকদের আবির্ভাব ও প্রতিষ্ঠায় ‘জলজ’-এর অবদান অনস্বীকার্য। বহু তরুণ কবিকে এটি প্রথম পরিচিতি দিয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে এত দীর্ঘস্থায়ী, নিয়মিত এবং ভ্রাম্যমাণ সাহিত্য আড্ডা আর নেই বললেই চলে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় ‘জলজ’-এর শততম সংখ্যা—একটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। সময়ের স্রোতে গড়ে ওঠা এই সাহিত্য-যাত্রা কেবল আড্ডা নয়, ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এটি এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
জলজ’র শততম সংখ্যার আনুষ্ঠানিক আত্ম:প্রকাশ
