রমেন্দ্র গোস্বামী, ধর্মনগর, ৩ মার্চ :- হোলি বা দোল – এই উৎসব শুধু রঙের উচ্ছ্বাস নয়, এটি মানব জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য আনন্দ -অনুভূতি। বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে যখন প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে ওঠে, তখন মানুষও রঙের ছোঁয়ায় নবজীবনের আনন্দ খুঁজে পায়। শীতের কঠোরতা পেরিয়ে প্রকৃতির মতোই মানব মনও যেন উন্মুক্ত হয়ে ওঠে। এই উৎসব তাই শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। হোলির উৎপত্তি সম্পর্কে বহু কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। পুরাণ মতে, অসুর রাজা হিরণ্য কশিপুর অত্যাচার থেকে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করার কাহিনি হোলিকার দহন উৎসবের মূল ভিত্তি। এই কাহিনি সত্যের জয় এবং অন্যায়ের পরাজয়ের প্রতীক। উত্তর ভারতে হোলিকার দহন আজও সেই ঐতিহ্য বহন করে। অন্যদিকে বাংলায় দোলযাত্রা মূলত বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি দোলপূর্ণিমায় পালিত হয়। তাই বাংলায় দোল উৎসবের সঙ্গে ভক্তি, কীর্তন ও ধর্মীয় আবেগ গভীরভাবে জড়িত। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এই উৎসব নানা রূপে পালিত হয়। উত্তর প্রদেশের বৃন্দাবন ও মথুরায় শ্রীকৃষ্ণের লীলা স্মরণে হোলি বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। বাংলায় শান্তিনিকেতনে ‘বসন্ত উৎসব’ নামে দোলের এক অনন্য রূপ দেখা যায়, যা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবর্তন করেছিলেন। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা হলুদ পোশাকে আবির খেলায় মেতে ওঠে এবং নৃত্য-গীতের মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে। এই অনুষ্ঠান আজ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
হোলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে মিলনের আনন্দ। এই দিনে জাতি, ধর্ম, বর্ণের বিভাজন অনেকাংশে লুপ্ত হয়। ধনী- দরিদ্র, বড়-ছোট সকলেই একসঙ্গে রঙ খেলায় অংশ নেয়। মানুষ পরস্পরকে আলিঙ্গন করে, মিষ্টি বিনিময় করে এবং অতীতের মনোমালিন্য ভুলে নতুন সম্পর্কের সূচনা করে। ফলে হোলি সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। দোল বা হোলি কেবল বাহ্যিক রঙের উৎসব নয়, এটি মনের রঙেরও উৎসব। মানুষের জীবনে যেমন দুঃখ-কষ্ট, হতাশা ও ক্লান্তি রয়েছে, তেমনি আনন্দ ও আশা- ভরসাও রয়েছে। রঙের এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবন সবসময় একঘেয়ে নয়; পরিবর্তনই তার স্বাভাবিক নিয়ম। বসন্ত যেমন শীতের অবসান ঘটিয়ে নতুন পত্র-পল্লবে ভরিয়ে তোলে প্রকৃতিকে, তেমনি হোলিও আমাদের মনে নতুন আশা ও উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে।বর্তমান সমাজে যখন হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজন ক্রমশ বাড়ছে, তখন হোলির মতো উৎসব মানবতার বার্তা বহন করে। তবে এই উৎসব পালনের ক্ষেত্রে কিছু সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। কৃত্রিম রঙের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা উচিত। জল অপচয় না করে সংযতভাবে উৎসব পালন করা প্রয়োজন। তবেই এই আনন্দ প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘস্থায়ী হবে।সাংস্কৃতিক দিক থেকেও হোলির গুরুত্ব অপরিসীম। গান, নাচ, আবৃত্তি ও নাটকের মাধ্যমে এই উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে ও সংগীতে বসন্ত ও দোলের উল্লেখ বহুবার এসেছে। বসন্তের রঙিন আবেশ কবি ও সাহিত্যিকদের সৃষ্টিশীলতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীতে বসন্তের রূপ ও রঙের অনবদ্য বর্ণনা পাওয়া যায়, যা দোল উৎসবকে এক নান্দনিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। সবশেষে বলা যায়, হোলি বা দোল মানব জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য উৎসব, কারণ এটি আমাদের শেখায় মিলন, সম্প্রীতি ও আনন্দের শিক্ষা। এটি কেবল একটি দিন নয়, এটি এক অনুভূতি, যা মানুষকে মানুষে যুক্ত করে। রঙের আবিরে যখন চারদিক রাঙা হয়ে ওঠে, তখন মনেও যেন নতুন আলোর সঞ্চার হয়। তাই হোলি শুধু উৎসব নয়, এটি মানবতার রঙিন প্রতিচ্ছবি – যা যুগে যুগে আমাদের সমাজকে ঐক্য ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখবে।
রঙের আবিরে মানবতার বন্ধন
