কাছাড় জেলা প্রশাসনের মহা আয়োজন ঐক্য, মানবতা ও সংস্কৃতির সুরে মুখর হয়ে উঠল পুলিশ প্যারেড ময়দান
জনসংযোগ, শিলচর, ০৬ নভেম্বর :- বুধবার বিকেলে শিলচরের পুলিশ প্যারেড ময়দান এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী রইল। প্রায় পাঁচ হাজার কণ্ঠ একসঙ্গে গাইলেন “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” এক মহিমান্বিত সুরে প্রতিধ্বনিত হলো মানবতার চিরন্তন বার্তা। ভারতরত্ন ড. ভূপেন হাজারিকার ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কাছাড় জেলা প্রশাসন ও জেলা সাংস্কৃতিক পরিক্রমা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশাল সমবেত সঙ্গীতানুষ্ঠান পরিণত হলো ঐক্য, সহমর্মিতা ও মানবতার এক অনন্য উদযাপনে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আসাম সরকারের খাদ্য,গনবন্টন ও ভোক্তা বিষয়ক, খনিজ ও খনিজ সম্পদ এবং বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের মাননীয় মন্ত্রী শ্রী কৌশিক রায়। উপস্থিত ছিলেন আরও লোকসভা সাংসদ শ্রী পরিমল শুক্লবৈদ্য, রাজ্যসভা সাংসদ শ্রী কনাদ পুরকায়স্থ, শিলচর বিধায়ক শ্রী দিপায়ন চক্রবর্তী, উদারবন্দ বিধায়ক শ্রী মিহিরকান্তি সোম, কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত শ্রী মৃদুল যাদব, আই.এ.এস, সহ বহু বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রশাসনিক আধিকারিক।

দুপুর তিনটা বাজতেই যেন সুরের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল গোটা মাঠ জুড়ে। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, চা-বাগানের শ্রমিক, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য, এনসিসি ও এনএসএস ক্যাডেট, এনজিও প্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সরকারি কর্মচারী সবাই একত্রে মিশে গেলেন এক সুরে, এক অনুভবে। গোটা মাঠ জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো ড: ভূপেন হাজারিকার অমর সৃষ্টির ধ্বনি “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য”যা যেন এক নবজীবনের আহ্বান হয়ে উঠল।

মুখ্যবক্তার ভাষনে মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, “আজকের এই দিনটি প্রতিটি অসমবাসীর জন্য গর্বের দিন, কারণ আজ আমরা একসঙ্গে স্মরণ করছি সেই মানুষটিকে, যিনি সংগীতের মাধ্যমে মানবতার আদর্শকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। ড. ভূপেন হাজারিকা কেবল একজন সংগীতশিল্পী নন, তিনি ছিলেন মানবতার কণ্ঠস্বর, যিনি সুরে ও কথায় মিশিয়ে দিয়েছিলেন ভালোবাসা, ন্যায়, সাম্য আর মানবিকতার মূল দর্শন।” তিনি আরও বলেন, “মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও উদ্যোগের ফলেই আজ অসমের প্রতিটি জেলা এই দিনটিকে উৎসবের রূপে পালন করছে। মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ভূপেন হাজারিকার গান কেবল সুর নয় এগুলো অসমের আত্মার ভাষা, যা প্রতিটি মানুষকে একত্রে বেঁধে রাখে।”

মন্ত্রী আবেগভরে বলেন, ড:ভূপেন হাজারিকা আমাদের শিখিয়েছেন সংগীত কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সমাজকে জাগিয়ে তোলার এক মাধ্যম। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে আছে মানুষের কথা, শ্রমজীবী মানুষের কথা, নদীর বেদনা, প্রেমের চিরন্তন গান এবং মানবতার সুর। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, শিল্প মানে কেবল সৌন্দর্য নয়, শিল্প মানে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাঁর ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভালোবাসাই মানবতার মূল শক্তি।”

মন্ত্রী কৌশিক রায় জেলা প্রশাসনের প্রশংসা করে বলেন, “আজ কাছাড় জেলা প্রশাসন প্রমাণ করল, প্রশাসন কেবল বিভাগের সীমাবদ্ধ কার্য নয় এটি মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি সেতুবন্ধন। জেলা আয়ুক্ত শ্রী মৃদুল যাদব ও তাঁর সাংস্কৃতিক দপ্তরের দল এই মহা উদ্যোগকে সফল করে তুলেছেন। এই অনুষ্ঠান শুধু একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, এটি মানুষের হৃদয়ে মানবতার সুর জাগিয়ে তোলার এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব।” তিনি বলেন, “মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন, প্রতিটি জেলা যেন ড: ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টিকে মানুষের মনের গভীরে পৌঁছে দেয়। আজ কাছাড় সেই বার্তাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে। পাঁচ হাজার মানুষের কণ্ঠে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানে প্রতিধ্বনিত হয়েছে ঐক্যের অমর মন্ত্র।”

মন্ত্রী আরও বলেন, “আজকের এই দিনে আমি প্রত্যেক শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, শিল্পী ও কর্মকর্তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। কাছাড় দেখিয়েছে, অসমের সাংস্কৃতিক ঐক্য কত গভীর। ভূপেন হাজারিকা আজও আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছেন, তাঁর সুর আমাদের পথ দেখায়। তিনি ছিলেন নদীর স্রোত, পাহাড়ের প্রতিধ্বনি, শ্রমিকের স্বপ্ন যার সুর যুগ যুগ ধরে বয়ে যাবে।”

রাজ্যসভা সাংসদ শ্রী কনাদ পুরকায়স্থ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “ড: ভূপেন হাজারিকা ছিলেন এক প্রজন্মের বিবেক। তিনি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, কষ্ট ও ভালোবাসাকে এক সুরে বেঁধেছিলেন। তাঁর গান আমাদের শেখায় মানবতার চেয়ে বড় কিছু নেই। তিনি আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সুর আজও বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে।”
লোকসভা সাংসদ শ্রী পরিমল শুক্লবৈদ্য বলেন, “ড: ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টিগুলি আমাদের সমাজের আত্মার প্রতিফলন। তাঁর প্রতিটি গান একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। আজ সরকার যে উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে, তা তাঁর প্রতি এক অনন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমি চাই, নতুন প্রজন্ম তাঁর গান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও ঐক্যের পাঠ।”

জেলা আয়ুক্ত শ্রী মৃদুল যাদব তাঁর স্বাগত ভাষণে বলেন, “আজকের এই দিনটি কাছাড় জেলার জন্য এক গর্বের দিন। এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ‘Unity in Diversity’-এর এক জীবন্ত উদাহরণ। আমরা সবাই একত্রে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি সেই মানুষটিকে, যিনি তাঁর গান দিয়ে গোটা জাতিকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন।” তিনি আরও জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও শিল্পীর জন্য ডিজিটালি স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে, যা জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল পোর্টাল থেকে ডাউনলোড করা যাবে।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক অংশে ১৬ জন আমন্ত্রিত শিল্পী পরিবেশন করেন ড. ভূপেন হাজারিকার জনপ্রিয় গানগুলির সংকলন, যাঁরা পূর্বে খানাপাড়া, গুয়াহাটিতে তাঁর শতবর্ষ উপলক্ষে ১০০০ কণ্ঠের সমবেত সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের পরিবেশনা দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারীরা মানবশৃঙ্খল গঠন করে আবারও সমস্বরে গাইলেন “মানুষ মানুষের জন্য” এক আবেগঘন মুহূর্তে মুখর হয়ে ওঠে গোটা পুলিশ প্যারেড ময়দান।

এরপর মন্ত্রী কৌশিক রায় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অমলেন্দু ভট্টাচার্য ও ড. প্রদোষ কিরণ নাথকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রাজীব মোহন পান্ত-এর পক্ষ থেকে ড. ভূপেন হাজারিকার স্মারক মুদ্রা প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত (সাংস্কৃতিক বিষয়ক) শ্রীমতী ফিলিস হ্রাংচাল, এ সি এস. সহকারী আয়ুক্ত শ্রীমতী বহ্নিখা চেতিয়া, শ্রীমতী জুনালী দেবী, শ্রীমতী অঞ্জলি কুমারী, শ্রী মাসি টোপনো এবং শ্রীমতী দীপা দাস, সাংস্কৃতিক পরিক্রমা শাখা আধিকারিক ও তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তরের উপ-সঞ্চালক, তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয় শিলচর, সহ অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিকবৃন্দ।

একই সঙ্গে লক্ষীপুর সম জেলা আয়ুক্তের কার্যালয় প্রাঙ্গণে সমান মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয় ড. ভূপেন হাজারিকার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সম জেলা আয়ুক্ত শ্রী ধ্রুবজ্যোতি পাঠক, এসি এস, আসাম সরকারের মণিপুরি উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারপার্সন শ্রীমতী রীনা সিংহ এবং লক্ষীপুর পৌর বোর্ডের চেয়ারম্যান শ্রী মৃণাল কান্তি দাস। ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠে আবারও ধ্বনিত হয় “মানুষ মানুষের জন্য”যা প্রমাণ করে, ড: ভূপেন হাজারিকার সুর আজও বরাক উপত্যকার মানুষের প্রাণে প্রবাহিত।

দিনের শুরুতে সকালেই তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয়, শিলচর থেকে সম্প্রচারিত হয় ড. ভূপেন হাজারিকার অমর সুরসম্ভার, যার মধ্য দিয়েই সূচনা হয় সুরময় এক দিনের।
