শাস্ত্রে পেঁয়াজ রসুন ভক্ষন নিষিদ্ধ কেন?

স্বভাবতই পার্টিতে গিয়ে আমি শুধু কোল্ড ড্রিংকস আর কাজু বাদাম খেয়ে সময় অতিবাহিত করছিলাম। তিনি তা লক্ষ করে জিজ্ঞেস করেন, ” ক্যায়া বাত হে ব্যাটা, তু কুছ লেতা কিও নেহী?” আমি কাচুমাচু করে বললাম,-” স্যার, ম্যা তো শাকাহারী হুঁ, পেঁয়াজ লসুন নেহী লেতা।”

আমি ভাবছিলাম তিনি আমার কারন শুনে বিরক্ত হবেন। কিন্ত তিনি যারপরনাই খুশী হয়ে গেলেন। আমার পিঠ চাপরে বললেন,-” বহুত বড়িয়া!! তু বহুত উপর যায়েগা ব্যাটা। যো লোগ শাকাহারী হোতে হ্যা,- অউর পেঁয়াজ লসুন নেহী খাতে হ্যা,- উন লোগোকা দিমাগ বহুত শান্ত হোতা হ্যা। ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন মে তুড়ন্ত ডিসিশন লেনেমে ইয়ে লোগ বহুত সক্ষম হোতে হ্যা। কনসেনট্রেশান বহুত জ্যাদা হোতা হ্যা উন লোগো কা।”

আমি ইতস্তত করে বললাম, – “না স্যার, এসব তো শুধু কথার কথা৷ আমার এমন কোন গুন নেই। যারা পেঁয়াজ রসুন খায় তাদেরও কনসেনট্রেশান যথেষ্ট ভাল হয়।”

তিনি আমার প্রত্যুত্তরে একটু ক্ষুন্ন হলেন। বললেন,-” আমি কোন কথা এমনি এমনি বলিনা। যা আমি বলেছি সেগুলি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত। অনেক গবেষণার রিপোর্ট রয়েছে এই সিদ্ধান্তের উপর। আমি সেই গবেষণালব্ধ রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই এই কথাগুলি বলেছি।”

পরেরদিন তিনি বেশ কিছু রিসার্চ আর্টিকেলের লিংক দিলেন আমায়। দুইদিন যাবৎ সেগুলি পড়ে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আমাদের ঋষিরা যে সাত্ত্বিক আহারের কথা বলে গেছেন,- তা যে কতটা বিজ্ঞানসম্মত ও স্বাস্থপ্রদ, – সেই সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই ছিলনা এতদিন।

পেঁয়াজ রসুনের মধ্যে Sulphoxide নামে এক যৌগ রাসায়নিক উপাদান বর্তমান যার মধ্যে Sulfinyl( SO) নামে কার্যকরী রাসায়নিক গ্রুপের উপস্থিতি রয়েছে৷ New York Times এ প্রকাশিত এক গবেষনাপত্রে( ১) পেঁয়াজ রসুনকে গানপাউডারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ন বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এদের মধ্যে উপস্থিত এই সালফার যৌগ প্রকৃতিপ্রদত্ত এক দারুন আত্মরক্ষার উপায় হিসাবে ব্যাবহৃত হয়। পোকামাকড় বা কোন জীবজন্তু পেঁয়াজ রসুন খেতে এসে দাঁত বসালেই পেঁয়াজ রসুনের কোষ হতে নিঃসৃত এই সালফার যৌগ এক তীব্র গন্ধ ছড়ায়, জ্বালা সৃষ্টি করে। ফলে কোন কীটপতঙ্গ বা জীবজন্তু দ্বিতীয়বার পেঁয়াজ রসুন খেতে আসেনা। এই রাসায়নিক উপাদান জীবানুনাশক হিসাবে কাজ করে, কীটপতঙ্গকে দূরে রাখে এবং কুকুর বেড়ালের রক্তে প্রয়োগ করে দেখা গেছে তা রক্তের লোহিত কনিকা নষ্ট করে দেয়।

রসুনের কোষে allicin (2-Propene-1-sulfinothioic acid S-2-
Propenyl Ester) নামে এক রাসায়নিক পদার্থ উৎপন্ন হয় যা রসুনের তীব্র গন্ধের ( aroma) জন্য দায়ী। এই রাসায়নিক পদার্থটি মানুষের কোষের উপর তার ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে সক্ষম বলে প্রমানিত।

পেঁয়াজের কোষে উৎপন্ন সালফার যৌগ অত্যন্ত সূক্ষ ও নিম্নভরসম্পন্ন হওয়ায় তা বাঁয়ুবাহিত হয়ে আমাদের চোখে-নাকে এসে এক তীব্র জ্বালা সৃষ্টি করে, অশ্রু নিঃসৃত করে।

Dr. Robert [Bob] C. Beck, DSc. তাঁর গবেষণাপত্রে রসুনকে বিষাক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি তার গবেষণায় লক্ষ করেন রসুনে উপস্থিত sulphone
hydroxyl ion মস্তিস্কের blood-brain-barrier অতিক্রম করে মস্তিস্ক কোষে প্রবেশ করে কোষের ক্ষতিসাধন করে।

১৯৫০ সালে Doc Hallan’s group নামক এক Flight Test Engineering সংস্থায় কর্মরত ফ্লাইট সার্জন সেই সংস্থায় কর্মরত সকল পাইলটদের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন,- ” প্লেইন চালানোর ৭২ ঘন্টা আগে থেকে পেঁয়াজ রসুন স্পর্শ করা চলবে না।” কারন,- পেঁয়াজ রসুন খেলে আপতকালিন সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তিন থেকে চারগুন শ্লথ হয়ে যায়। দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীলতায় ঘাঁটতি দেখা দেয়৷ তার সেই নিয়ম মেনে আজও বিশ্বের বহু বিমান সংস্থায় পাইলটগন বিমানে চড়ার বাহাত্তর ঘন্টা আগে থেকে মাদক, পেঁয়াজ, রসুন স্পর্শ করেন না।

Alpha-Metrics Corporation নামক বায়োইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থায় কর্মরত Dr. Beck তার আবিস্কৃত এক Biofeedback equipment নিয়ে গবেষণাকালে লক্ষ করেন রসুন খেলে কিছুক্ষনের জন্য মানুষের brain wave অবিন্যস্ত ( desynchronized) হয়ে যায়। মধাহ্নভূজনে রসুন খেয়ে আসা কিছু ব্যাক্তির encephalogram করে তিনি লক্ষ করেন সেই মুহুর্তে মানুষগুলির ব্রেইনের তরঙ্গ মৃতপ্রায় অসুস্থ মানুষের ব্রেইন তরঙ্গের সমতূল্য।

Standford এ অনুষ্ঠিত এক গবেষণাপত্রে বলা হচ্ছে, – “এমন সব রোগী যাদের সর্বক্ষন মৃদু মাথা ব্যাথা লেগে থাকে এবং তারা দিনের শেষে কাজে মনসংযোগ করতে পারেনা, – তাদেরকে তিন সপ্তাহের জন্য পেঁয়াজ রসুন থেকে দূরে রাখলে দারুন প্রতিকার লক্ষা করা যায়। “সেই গবেষণাপত্রেই লেখা হয়েছে, – “Garlic can affect the mind and Concentration. Do Not Eat it
if Performing Activities Requiring Concentration and Mental Acuity.”

ইদানীং বহু গবেষণায় লক্ষ করা গেছে রসুন মানুষের শরীরে এলার্জির সৃষ্টি করে, পরিপাকতন্ত্রে কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ডাইরিয়া ঘটাতে সক্ষম। সেই গবেষণাপত্রেই লিখা হয়েছে, – ” যদিও রসুনের কিছু উপকারী ঔষধি গুন রয়েছে, – তথাপি খাদ্য হিসাবে রসুনের ক্ষতিকর প্রভাবই অধিক।”

যারা অর্গানিক গার্ডেনিং করেন তারা জানেন,- সব্জির বাগানে পোকামাকড় দূর করার জন্য DDT এর পরিবর্তে রসুন ব্যাবহার করলে পোকামাকড় থেকে বেশ মুক্তি পাওয়া যায়।

বিখ্যাত রোমান কবি Horace তার লেখা কাব্যগ্রন্থ Epodes এ রসুন সম্পর্কে লিখেছেন,-” More poisonous than hemlock”

Shakespeare এর Midsummer Nights Dream নামক নাটকে Bottom নামক চরিত্রটি অপর একজন অভিনেতাকে রসুন খেতে নিষেধ করছেন,- কারন আমাদের নিঃশ্বাসে মিষ্টি গন্ধ ছড়ানোই উদ্দেশ্য।

গ্রীক সভ্যতায় আভিজাত পরিবারগুলোতে পেঁয়াজ রসুন খাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এবং এই জাতীয় খাদ্যগ্রহনকে তারা অসভ্যতা বলে গন্য করত। পেঁয়াজ রসুন খেয়ে মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ ছিল।

রেইকি অভ্যাসকারীরা পেঁয়াজ রসুনকে মাদক দ্রব্যের মতই এড়িয়ে চলেন৷ তারা বিশ্বাস করেন পেঁয়াজ রসুন মানুষের শরীর ও মনের কর্মক্ষমতা হ্রাস করে।

হাজার বছর যাবৎ জাপানের Taoists সম্প্রদায় পেঁয়াজ রসুনকে তাদের স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর বলে মেনে আসছে।

অনেকেই তর্কের খাতিরে বলে থাকেন, – পৃথিবীর এত এত মানুষ রোজ পেঁয়াজ রসুন খাচ্ছেন। তাদের এমন কি ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে? তারা সবাই তো ভালই আছে৷ সর্বোতভাবে তা সত্য। যেমনটা, – পৃথিবীর বহু মানুষ প্রতিদিন মদ-বিড়ি-গাঁজা খাচ্ছে, ড্রাগ নিচ্ছে তবু ভালই দিনযাপন করছে। ক্ষতিটা সবসময় নজরে পড়েনা।

পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর শত বছর পূর্বে পদ্মার তীরে এক গ্রামবাংলায় বসে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেছিলেন, – “মাছ মাংস খাসনে আর, পেঁয়াজ রসুন মাদক ছাড়।” তাঁর সেই নির্দেশ মেনে আজ কতশত মানুষ এক বিজ্ঞানসম্মত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করছে, – তার ইয়ত্তা নেই।