ধলাইয়ে শুশ্রূষা সেতুর আওতায় মেগা হেলথ ক্যাম্পের শুভ সূচনা সেবা সপ্তাহে কাছাড় জেলা প্রশাসনের যুগান্তকারী স্বাস্থ্য উদ্যোগে প্রথম দিনেই ৩,৫৭৩ জন শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন
জনসংযোগ , শিলচর, ১৮ সেপ্টেম্বর :- কাছাড় জেলার ধলাই বিধানসভা কেন্দ্র বৃহস্পতিবার প্রত্যক্ষ করল স্বাস্থ্যসেবার এক ঐতিহাসিক সূচনা। “সেবা হি সমর্পণ সেবা সপ্তাহ”-এর দ্বিতীয় দিনে ধলাইয়ের বিএনএমপি স্কুল প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চালু হল এলএসি-ভিত্তিক প্রথম ‘মেগা হেলথ ক্যাম্প’ মুখ্য প্রকল্প, ‘শুশ্রূষা সেতু”।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ধলাই সমষ্টির বিধায়ক নীহার রঞ্জন দাস, শিলচরের সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, রাজ্যসভার সাংসদ কনাদ পুরকায়স্থ, কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত, মৃদুল যাদব আইএএস, ধলাই সম জেলার সম জেলা আয়ুক্ত রক্তিম বড়ুয়া এসিএস, স্বাস্থ্য বিভাগের যুগ্ম সঞ্চালক, ডাঃ শিবানন্দ রায়, সহকারী আয়ুক্ত, নেইহাট হাওলাই এসিএস ও দীক্ষা সরকার, এসিএস সহ বিশিষ্ট প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকগন।

অনুষ্ঠানের মুখ্য অতিথি, ধলাই বিধায়ক নীহার রঞ্জন দাস তাঁর আবেগঘন ভাষণে বলেন, “আজ ধলাইবাসীর জন্য ঐতিহাসিক দিন। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আমাদের ধলাইকে প্রথম কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়ে যে আস্থা দেখিয়েছেন, তা আমাদের কাছে এক গর্বের বিষয়। এই স্বাস্থ্য শিবির কেবল চিকিৎসার আয়োজন নয়, এটি মানুষের মনে নিরাপত্তা ও আস্থার বীজ বপন করছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “শিলচর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডাঃ ভাস্কর গুপ্ত যেভাবে নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়িয়েছেন, তা বরাক উপত্যকার গর্ব।”
এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে শিলচর সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য বলেন, “আজকের এই শিবির কেবল ধলাই নয়, সমগ্র কাছাড়বাসীর জন্য এক আশার আলো। আমি প্রত্যেক অভিভাবককে অনুরোধ করছি আপনারা সন্তানদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান, সুস্থ অভ্যাস গড়ে তুলুন। যোগব্যায়ামকে জীবনের অংশ করুন, শৃঙ্খলা মেনে চলুন, আর সর্বপ্রকার ক্ষতিকর আসক্তি ত্যাগ করুন তাহলেই আমরা এক সুস্থ ও শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলতে পারব।” তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্বাস্থ্য খাতে রূপান্তরমূলক সংস্কারের প্রশংসা করে বলেন, “‘আয়ুষ্মান ভারত’ থেকে শুরু করে ‘অটল অমৃত অভিযান’ প্রতিটি কর্মসূচি মানুষের দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে।”

রাজ্যসভার সাংসদ কনাদ পুরকায়স্থ তাঁর উচ্ছ্বসিত ভাষণে মেগা হেলথ ক্যাম্পকে কেবল চিকিৎসা শিবির হিসেবে না দেখে এক মানবিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। সুস্থ সমাজই সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের ভিত্তি। আজকের এই ‘শুশ্রূষা সেতু’ ক্যাম্প আসলে সরকারের সহমর্মিতা ও সমাজসেবার প্রতীক। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট কোনো মা, কোনো শিশু, কোনো প্রবীণ যেন স্বাস্থ্যসেবার বাইরে না থাকে।”
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে যোগ করেন, “সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আয়ুষ্মান ভারত থেকে অটল অমৃত অভিযান, আধুনিক মেডিকেল কলেজ থেকে মোবাইল হেলথ ইউনিট প্রতিটি উদ্যোগ মানুষের হাতে সুলভ স্বাস্থ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এ এক সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, গ্রাম থেকে শহর কোথাও কেউ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন না।”

সাংসদ পুরকায়স্থ মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মার জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করে বলেন, “আজকের এই আয়োজন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে গিয়ে ডাক্তার, নার্স, আশা কর্মী, স্বেচ্ছাসেবকরা যে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, তাঁদের নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা এই উদ্যোগকে সার্থক করে তুলছে।”
তিনি জনতাকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এই ক্যাম্পকে কেবল এক দিনের অনুষ্ঠান হিসেবে দেখবেন না। এটিকে নতুন এক সুস্থ জীবনযাত্রার সূচনা হিসেবে গ্রহণ করুন। সকলে মিলে সম্মিলিতভাবে আমরা যদি এগিয়ে আসি, তবে আমরা অবশ্যই এক সুস্থ, শক্তিশালী ও রোগমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।”

বক্তব্য রাখতে গিয়ে কাছাড় জেলা আয়ুক্ত, মৃদুল যাদব বলেন, “‘শুশ্রূষা সেতু’ আসলে প্রতিটি পরিবারে আস্থার সেতু গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। আমাদের জেলা প্রশাসন সর্বদা নজরদারি চালিয়ে যাবে, যাতে কোনো নাগরিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে তার স্বাগত ভাষণে যৌথ স্বাস্থ্য পরিচালক ডাঃ শিবানন্দ রায় জানান, এই শিবির মূলত ০ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের জন্য পরিকল্পিত। শিশুস্বাস্থ্য, স্নায়ুবিদ্যা, চোখ, নাক-কান-গলা সহ সমস্ত ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এখানে উপস্থিত আছেন। তাঁর কথায়, “আমরা চাই, কোনো শিশুই যেন গুণগত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।”

উল্লেখ্য, প্রথম দিনেই বিপুল সাড়া ফেলে এই ক্যাম্প। ৩,৫৭৩ জন শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়। ১৯ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একযোগে বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসা পরামর্শ দেন, ৩৩৩ জন রোগীকে বিশেষ রেফারেল দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধিতা শংসাপত্র এবং আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য কার্ডও বিতরণ হয়। অসম ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন, মোবাইল মেডিকেল ইউনিট, মাতৃভূমি এনজিও ও ১০৮ অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা পুরো আয়োজনকে সার্থক করে তোলে।
অনুষ্ঠানের শেষে সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, সাংসদ কনাদ পুরকায়স্থ, বিধায়ক নীহার রঞ্জন দাস ও জেলা আয়ুক্ত, মৃদুল যাদব ক্যাম্পের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন, চিকিৎসক ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখেন।

“শুশ্রূষা সেতু’-র এই সাফল্য ধলাই থেকে শুরু করে পুরো কাছাড় জেলায় স্বাস্থ্যসেবার এক নতুন অধ্যায় রচনা করল। আধুনিক চিকিৎসা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সমন্বয়ে এই উদ্যোগ আগামী দিনের জন্য এক সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের অঙ্গীকার বহন করছে।
