রত্নজ্যোতি দত্ত
নতুন দিল্লি, ০৩ মার্চ :- একুশ শতকে ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ঘোষণা করেন রিলায়েন্স কর্ণধার মুকেশ আম্বানি। একই সঙ্গে আম্বানি এআই-কে সবার জন্য সহজলভ্য করতে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬-এ মূল বক্তব্য রাখতে গিয়ে আম্বানি বলেন, ভারতের এআই ভাবনা “বিকশিত গ্লোবাল সাউথ”-এর জন্য একটি আদর্শ মডেল হতে পারে। প্রযুক্তিগত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বদলে সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ, ব্যয়বহুল এবং নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকতে পারে না,” বলেন আম্বানি। “ভারত এমন এক ভবিষ্যতে বিশ্বাস করে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবার জন্য প্রাপ্য, সাশ্রয়ী এবং উপকারী।” ভারতের স্বাধীনতার শতবর্ষ ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্যের পথে এই সম্মেলন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বে “অপরিসীম প্রাচুর্য” এবং আটশো কোটি মানুষের জন্য সমৃদ্ধির নতুন যুগ সূচনা করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিনিয়োগ :-
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় পদক্ষেপ ঘোষণা করে আম্বানি জানান, রিলায়েন্স ও জিও আগামী সাত বছরে ১০ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে, যাতে দেশের নিজস্ব সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সক্ষমতা গড়ে তোলা যায়। “এটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, জাতি-গঠনের মূলধন,” বলেন আম্বানি এবং জোর দিয়ে বলেন, “ভারত বুদ্ধিমত্তা ভাড়া নিয়ে চলতে পারে না।” আম্বানি জিও ইন্টেলিজেন্সের অধীনে তিনটি প্রধান উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
গিগাওয়াট-স্তরের ডেটা সেন্টার :- জামনগরে বহু-গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রস্তুত ডেটা সেন্টার নির্মাণ। ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ১২০ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতা চালু হবে এবং ধাপে ধাপে গিগাওয়াট স্তরে সম্প্রসারণ করা হবে। সবুজ শক্তির ব্যবহার :- কচ্ছ ও অন্ধ্রপ্রদেশের সৌর প্রকল্প থেকে প্রায় ১০ গিগাওয়াট উদ্বৃত্ত নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে টেকসইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো পরিচালনা। সারাদেশে প্রান্তিক গণনাপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক :- জিওর দূরসংযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিত একটি প্রান্তিক গণনাপ্রযুক্তি স্তর গড়ে তোলা, যা গ্রাম থেকে মহানগর – সর্বত্র কম বিলম্বে ও সাশ্রয়ী মূল্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিষেবা পৌঁছে দেবে। আম্বানি বলেন যে জিও ভারতকে ইন্টারনেট যুগে যুক্ত করেছিল, সেই জিও-ই এবার দেশকে “বুদ্ধিমত্তার যুগে” যুক্ত করবে এবং মোবাইল ডেটার মতোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিষেবার খরচ নাটকীয়ভাবে কমাবে।
ভারতের ডিজিটাল শক্তি :-
গত এক দশকে ভারতের ডিজিটাল রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে আম্বানি বলেন, দেশে প্রায় একশো কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে, বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন ডেটা খরচ, আধার ব্যবস্থায় ১৪০ কোটিরও বেশি ডিজিটাল পরিচয়, মাসে ১২ বিলিয়নের বেশি ইউপিআই লেনদেন, এবং এক লক্ষের বেশি স্টার্টআপ। জনসংখ্যাগত শক্তি, গণতন্ত্র, ডিজিটাল জনপরিকাঠামো, তথ্য উৎপাদন এবং দ্রুত উন্নয়নের ভিত্তিতে ভারত বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতায় অনন্য অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি জানান।
সর্বক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা :-
আম্বানি বলেন, জিও ইন্টেলিজেন্স কেবল কথোপকথনভিত্তিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও অন্তর্ভুক্তিকেই অগ্রাধিকার দেবে। দেশের সব ভাষায় বিশ্বমানের বহুভাষিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির অঙ্গীকার করেন তিনি, যাতে কৃষক, কারিগর ও ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মাতৃভাষায় সুবিধা পান।
তিনি যে উদ্যোগগুলির কথা উল্লেখ করেন, সেগুলি হলো :-
• জিওশিক্ষক :- ২২টি ভাষায় উপলব্ধ অভিযোজিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাসহায়ক।
• জিও আরোগ্যএআই :- পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান।
• জিওকৃষি :- ১৪০ মিলিয়ন কৃষকের জন্য উপগ্রহ ও আবহাওয়া-ভিত্তিক পরামর্শ।
• জিওভারতআইকিউ :- সরকারি পরিষেবা, দক্ষতা ও জীবিকা সংক্রান্ত সহায়তার জন্য কণ্ঠ-ভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক।
এছাড়া জিওফ্রেমস স্মার্ট চশমা এবং জিওহটস্টারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সমৃদ্ধ কনটেন্ট ভারতের সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিশ্বে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে জানান তিনি।
বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান :-
বৈশ্বিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে আম্বানি সতর্ক করেন যে চিপ ও বিরল খনিজ সম্পদের মজুতকরণ এবং মেরুকরণ বিশ্বে বৈষম্য বাড়াতে পারে।
“কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার জাদু দেখায় ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে, মজুত করে রাখার মাধ্যমে নয়, সহযোগিতার মাধ্যমে, সংঘাতের মাধ্যমে নয়,” বলেন তিনি এবং “ওয়ান আর্থ, ওয়ান ফ্যামিলি, ওয়ান ফিউচার”-এর নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি দেশগুলিকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সহমর্মিতা মিলিয়ে একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
