কবীন্দ্র পুরকায়স্থ:: এক বন্ধুপুত্রের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

রত্নজ্যোতি দত্ত , নুতন দিল্লি, ০৭ ডিসেম্বর :- আমার বাবার আজীবনের বন্ধু এবং আমাদের জীবনের এক অভিভাবক কবীন্দ্র পুরকায়স্থের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। ০৭ জানুয়ারী ৯৪ বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়েছে, তাঁর শেষতম জন্মদিন পালনের কিছু দিন পরেই। তাঁর চলে যাওয়াটা আমার কাছে এক ব্যক্তিগত ক্ষতি বলে মনে হচ্ছে; আর পেছনে রেখে গেল স্মৃতিতে ঘেরা এক নিস্তব্ধতা। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী পুরকায়স্থ ছিলেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যতম আদি এবং শক্তিশালী রূপকার। জনসেবার বৃহত্তর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি দক্ষিণ অসমের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। রাম জন্মভূমি আন্দোলনের আবহে শিলচর থেকে প্রথমবার লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগে, প্রায় এক দশক ধরে তিনি অটল বিশ্বাস ও অসীম ধৈর্যের সাথে বারবার নির্বাচনী পরাজয় সহ্য করেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে পরবর্তী আড়াই দশকে তিনি তিনবার শিলচরের প্রতিনিধিত্ব করেন লোকসভায়। অটল বিহারী বাজপেয়ী নেতৃত্বাধীন তেরো মাসের জোট সরকারেও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন – যে জোট শাসনের ভিত্তি আজও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থাকে অনুপ্রাণিত করছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা অসম, এবং বিশেষ করে দক্ষিণ অসমের বরাক উপত্যকার জন্য পুরকায়স্থ মহাশয় ছিলেন দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রবাদী আন্দোলনের এক পুরোধা ব্যাক্তিত্ব। তিনি ছিলেন রাজনৈতিক আঙিনায় এক বিশ্বাসযোগ্য ও শ্রদ্ধার পাত্র।

তিনি প্রায়ই বলতেন, ১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মাসব্যাপী অফিসার্স ট্রেনিং ক্যাম্পে (ওটিসি) তৎকালীন প্রধান গুরুজী এম. এস. গোলওয়ালকর কীভাবে তাঁর বিশ্ববীক্ষা তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমি প্রথম এই স্মৃতিকথা শুনেছিলাম শিলচরের কাছে আমাদের গ্রামের বাড়িতে, যখন তিনি আমার পূজ্যনীয় পিতৃদেবের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন – যিনি ছিলেন ১৯৫১ সালের নাগপুরের আরএসএস ওটিসি-তে তাঁর ব্যাচমেট।

তাঁর কাছ থেকেই আমি জেনেছিলাম যে সে সময়ে আরএসএস-এর প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং এক মাসব্যাপী দীর্ঘ এক প্রক্রিয়া, যা শৃঙ্খলা, চিন্তা এবং সেবার ক্ষেত্রে নবযুবকদের মধ্যে এক চিরস্থায়ী ছাপ রাখতো। তাঁর সেই কথোপকথনগুলোতে প্রতিফলিত হতো ত্যাগের মহিমা আর রাষ্ট্রবাদের আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্য।

পুরকায়স্থ মহাশয়ের সাথে আমার যোগাযোগ পরবর্তী বছরগুলোতেও বজায় ছিল – বিশেষ করে তাঁর তৃতীয় দফার সংসদীয় মেয়াদের সময় প্রায়ই দেখা হতো পুরনো সংসদ ভবনের চত্বরে বা কখনও কখনও বিরতির সময়ে লোকসভার লাইব্রেরিতে। সেই সময় আমি আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের (Reuters) প্রতিনিধি হিসেবে ভারতীয় সংসদে নিয়মিত যাতায়াত করতাম। আমাদের আলোচনা খুব সহজভাবেই আদর্শ ও জননীতি থেকে ঘুরে গিয়ে আমার বাবার স্বাস্থ্যের প্রতি তাঁর বন্ধু সুলভ উদ্বেগে গিয়ে পৌঁছাত। সেই মুহূর্তগুলোতে অভিজ্ঞ জননেতার আড়ালে থাকা এক পরম সংবেদনশীল মানুষের দেখা মিলত।

তাঁর মানবিক ব্যাক্তিত্বের এক কথা আমার স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে আছে। আমার বাবা যখন অন্তিম শয্যায়, তখন পুরকায়স্থ মহাশয় নয়ডা এক্সটেনশনে আমাদের বাড়িতে তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। আমার মনে আছে বাবা তাঁকে চিনতে পারার সাথে সাথে কিভাবে তাঁর চোখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, যা তাঁর অসুস্থতাকে সাময়িকভাবে হলেও সেদিন ম্লান করে দিয়েছিল। দুই পুরনো বন্ধুর মধ্যেকার সেই নীরব আলাপ দীর্ঘ জীবনের বিশ্বস্ততার সাক্ষ্য দিচ্ছিল। আমার বাবা, প্রয়াত রাধাপদ দত্ত – যিনি অসমের একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় সমাজসেবী ছিলেন – পুরকায়স্থ মহাশয়ের সান্নিধ্যে সেদিন গভীর মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। আমি বিশ্বাস করি, পুরকায়স্থ মহাশয় নিজেও বাবার সেই বহুদূরে এসে দেখে যাওয়ার জন্য বন্ধুসুলভ নির্বাক কৃতজ্ঞতা অনুভব করেছিলেন। রাজনীতির ঊর্ধ্বে, কবীন্দ্র পুরকায়স্থ মহাশয় প্রকৃত অর্থে হৃদয়ে ছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি বহু প্রজন্মের তরুণ দলীয় কর্মী ও সহকর্মীদের পথ দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন অগণিত নব প্রজন্মকে এবং তাদের আগলেও রেখেছেন আপত্য স্নেহে।

বরাক উপত্যকার বহুল প্রচলিত দৈনিক যুগশঙ্খ পত্রিকায় আমার বাবার প্রয়াণে তাঁর দেওয়া বিশেষ শোকবার্তাটি ছিল তাদের বন্ধুত্বের গভীরতার প্রতিফলন। সেই লেখার মাধ্যমে তিনি আমাকেও তাঁর আশীর্বাদ দিয়েছিলেন – একজন সর্ব্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতা হিসেবে নয়, বরং মিশ্রিত ছিল প্রিয় বন্ধুর পুত্রের প্রতি থাকা এক গুরুজনের স্নেহ ও ভালোবাসা ।

তাঁর প্রয়াণে আমরা শুধু একজন সত্যিকারের জনসেবায় নিয়োজিত রাজনীতিবিদকেই হারাইনি, আমরা হারিয়েছি একজন অভিভাবক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীকে, যাঁর পরামর্শ, স্নেহ এবং ধৈর্য্য শক্তি আমাদের আগামীর দিনের পথ চলায় সঙ্গী হয়ে থাকবে। কবীন্দ্র পুরকায়স্থ মহাশয়ের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জনসেবা যখন মানবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তখন তা ক্ষমতা বা পদের চেয়েও অনেক গভীর ছাপ রেখে যায়। ওম শান্তি