দুই বন্ধুর স্বপ্ন থেকে দেশের আকাশ দখল – ইন্ডিগোর উড়ান কাহিনি

সংবাদ সংস্থা, ৭ ডিসেম্বর :- ভারতের বিমান পরিবহণ ইতিহাসে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের উত্থান এক অনন্য অধ্যায়। ভাড়ার প্লেনে দুই বন্ধুর হাত ধরে শুরু হওয়া এই সংস্থা আজ শুধু ভারতের বৃহত্তম বিমান সংস্থা নয়, এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এয়ারলাইন। সাম্প্রতিক সময়ে টানা বেশ কয়েকদিন ফ্লাইট বাতিলের কারণে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকলেও, ইন্ডিগোর সাফল্যের গল্প আরও বহু বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে।

চারদিনের বিপর্যয় :- ফ্লাইট বাতিলের জেরে অচলাবস্থা…

৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ইন্ডিগোর (Indigo Flight Cancellation) ব্যাপক ফ্লাইট বাতিলের জেরে কার্যত থমকে যায় দেশের বিমান পরিবহণ। শুক্রবার একদিনেই ১০০০-র বেশি উড়ান বাতিল হয়, তার আগের দিন ৫৫০টিরও বেশি ফ্লাইট বন্ধ থাকে। ভারতের বিমান বাজারের ৬০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে ইন্ডিগো – প্রতিদিন যাত্রীদের মধ্যে ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই ইন্ডিগো ধরেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অল্প কিছু ফ্লাইট বন্ধ থাকাতেই গোটা সিস্টেমে বিপর্যয়ের ছাপ পড়ে।

২০০৫ সালে রাহুল ভাটিয়া এবং রাকেশ গাঙ্গওয়াল – এই দুই বন্ধু মাত্র একটি বিমান দিয়ে শুরু করেছিলেন ইন্ডিগো। সেই সময় জেট এয়ারওয়েজ, এয়ার ইন্ডিয়া এবং কিংফিশারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার প্রভাব ছিল তুঙ্গে। তবুও অত্যন্ত কৌশলী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও নির্ভরযোগ্য পরিষেবা দিয়ে ইন্ডিগো দ্রুত দেশের আকাশে আধিপত্য স্থাপন করে। ইন্ডিগোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা রাহুল ভাটিয়ার সম্পদের পরিমাণ আজ ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। রাকেশ গাঙ্গওয়ালের আনুমানিক সম্পদ ৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

‘ইন্ডিগো’ নামের গল্প।

‘ইন্ডিয়া অন দ্য গো’ – এই বাক্যাংশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সংস্থাটির নাম রাখা হয় IndiGo

বিশ্বব্যাপী বোয়িং ও এয়ারবাস – এই দুটি সংস্থার বিমানই মূলত ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় বাজারে বোয়িংয়ের আধিপত্য থাকায় ইন্ডিগো এয়ারবাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এয়ারবাস ৪০–৫০ শতাংশ ছাড়ে ইন্ডিগোর প্রথম ১০০টি বিমান তৈরি করে। সেই বিমানগুলিই পরবর্তীতে লাভে বিক্রি করে ইন্ডিগো লিজ-ভিত্তিক অপারেশন শুরু করে এবং দ্রুত বিভিন্ন বড় শহরে কার্যক্রম বিস্তার করে।

ইন্ডিগো ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে সুলভ, নির্ভরযোগ্য ও সময়নিষ্ঠ পরিষেবা পৌঁছে দেয়। ব্যয়বহুল বিলাসের বদলে সংস্থাটি লো-কস্ট মডেল অনুসরণ করে এবং যাত্রীদের আস্থা অর্জন করে।

ইন্ডিগোর অভিযান: বছর ধরে মাইলফলক।

  • ২০১১ :- ১৮০টি এয়ারবাস এ৩২০-এর অর্ডার।
  • ২০১২ :- ৫০ কোটি যাত্রী পরিবহণ – দেশের বৃহত্তম এয়ারলাইন।
  • ২০১৫ :- আরও ১০০টি বিমান অর্ডার।
  • ২০১৯ :- ২৫০টি নতুন বিমান • অর্ডার।
  • ২০২০ :- (কোভিড): কার্গো পরিষেবা চালু।
  • ২০২৩ :- এক ধাক্কায় ৫০০টি বিমান অর্ডার – বিমান ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্ডার।
  • ২০২৩ :- ১০ কোটি যাত্রী পরিষেবার রেকর্ড।
  • ২০২৫ :- আগস্টে বাজারে ৬৪.২% শেয়ার।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইন্টারগ্লোব এভিয়েশন (ইন্ডিগোর মূল কোম্পানি)।

  • বাজার মূলধন :- ২.০৮ ট্রিলিয়ন টাকা (২৩.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
  • মার্চ ২০২৫-এ মোট সম্পদ :- ৯৩.৬৮ বিলিয়ন টাকা।
  • ২০২৫-এর মোট সম্পদ :- ১১৫,৮৪৩ কোটি টাকা (১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
  • ২০২৪ অর্থবছরের আয় :- ৬৮,৯০৪ কোটি টাকা।
  • ২০২৪ অর্থবছরের লাভ :- ৮,১৭২ কোটি টাকা।

ইন্ডিগো আজ ভারতের আকাশপথে নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক। সময়ানুবর্তিতা, সাশ্রয়ী পরিষেবা এবং বিশাল বিমানবহরের জোরে ২০২৫ সালে এক পর্যায়ে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান বিমান সংস্থা হিসেবেও উঠে আসে।

দুই বন্ধুর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই আজ ইন্ডিগো ভারতীয় বিমান পরিবহণের আকাশে অপ্রতিরোধ্য এক নাম।