সাংসদ-বিধায়ক ও আধিকারিকদের উপস্থিতিতে ঐক্য পদযাত্রা ও সাংস্কৃতিক উৎসব, হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে জেলা প্রশাসনের শ্রদ্ধাঞ্জলি জাতীয় সংহতি ও দেশগঠনের অনন্য প্রতিচ্ছবি
জনসংযোগ শিলচর, ৩১ অক্টোবর :- দেশপ্রেম, ঐক্য ও নাগরিক গর্বের অপরূপ সমাহারে শুক্রবার সকাল থেকেই যেন জেগে উঠেছিল গোটা কাছাড়। ভারতের লৌহপুরুষ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ১৫০তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে জেলা প্রশাসন, কাছাড় এবং মাই ভারতের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মহোৎসবে হাজারো নাগরিক, ছাত্রছাত্রী ও সরকারি আধিকারিক একত্রিত হন। ঐক্য পদযাত্রা, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে এই দিনটি হয়ে ওঠে জাতীয় সংহতি, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের এক মহৎ প্রতীক।
এই উদযাপনে অংশ নেন তিন হাজারেরও বেশি মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রী, এন এস এস, স্বেচ্ছাসেবী, স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস, ASLRM ও NULM-এর সদস্য, কৃষি, ক্রীড়া, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং শিলচর পৌর নিগমের প্রতিনিধিরা। প্রায় পঞ্চাশটি এনজিও ও যুব ক্লাবও অংশ নেয় এই ঐক্যযাত্রায়। শান্তি, সংহতি এবং আত্মনির্ভর ভারতের বার্তা বহনকারী এই পদযাত্রার সূচনা করেন শিলচর লোকসভার সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, রাজ্যসভার সাংসদ কনাদ পুরকায়স্থ, এবং খাদ্য,গনবন্টন, ভোক্তা বিষয়ক, খনি ও খনিজ এবং বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের মন্ত্রী শ্রী কৌশিক রায়। উপস্থিত ছিলেন জেলা আয়ুক্ত, শ্রী মৃদুল যাদব, আইএএস। তিনি নিজেও ছাত্রছাত্রী ও নাগরিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পদযাত্রায় অংশ নেন। গোটা শিলচর শহর যেন রঙিন হয়ে ওঠে দেশাত্মবোধের আবহে।

গান্ধী বাগে সমবেত জনতা প্রথমেই জাতির লৌহপুরুষ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন। তারপর শুরু হয় স্মারক অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল শিলচর সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্যের অনুপ্রেরণাদায়ক বক্তব্য। তিনি বলেন, “সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল শুধু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীই নন, তিনি ছিলেন ভারতের রাজনৈতিক ঐক্যের লৌহদৃঢ় মেরুদণ্ড।” সাংসদ শুক্লবৈদ্য আরও বলেন, “আজ আমরা একত্রিত হয়েছি জাতির এক মহান সন্তানকে স্মরণ করতে ভারতের লৌহপুরুষ, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে। তাঁর জীবন, কর্ম এবং দেশপ্রেম আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।”
তিনি বলেন, “গ্রামীণ গুজরাটের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কীভাবে দৃঢ় সংকল্প ও দেশপ্রেমে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্রগঠনের অগ্রভাগে উঠে এসেছিলেন, তা আমাদের প্রত্যেকের জন্য এক অনন্য প্রেরণা।” সাংসদ শুক্লবৈদ্য আরও যোগ করেন, “সর্দার প্যাটেলের জীবনগাথা কেবল সাহস ও ন্যায়ের নয়, তা হল দূরদৃষ্টি ও রাষ্ট্রনায়কত্বের গল্প। তিনি জানতেন কিভাবে ভিন্ন মত ও মানসিকতার মানুষদের এক ছাতার নিচে আনতে হয় দেশের স্বার্থে। তাঁর ভাবনা ছিল সর্বজনীন, সমন্বয়মুখী এমন এক ভারতের স্বপ্ন যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্যের বন্ধনই জাতির শক্তির মূল ভিত্তি।”

অনুষ্ঠানে রাজ্যসভার সাংসদ কনাদ পুরকায়স্থ তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “সর্দার প্যাটেলের অবদান ভারতের ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে অতুলনীয়। তাঁর সাহস, প্রজ্ঞা ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি আজকের ভারত গড়ার ভিত স্থাপন করেছে। তিনি আজও আমাদের শেখান ঐক্যই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি।” সাংসদ পুরকায়স্থ তরুণ সমাজকে আহ্বান জানান সর্দার প্যাটেলের শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও জাতীয় সেবার আদর্শ গ্রহণ করতে।
তিনি আরও বলেন, “গুজরাটের নাড়িয়ার গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও সর্দার প্যাটেল অক্লান্ত পরিশ্রমে লন্ডনে আইন অধ্যয়ন করে দেশের শীর্ষ আইনজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন। তারপর তিনি স্বদেশী আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। খেড়া ও বারদোলি সত্যাগ্রহের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যই তাঁকে ‘সর্দার’ উপাধি দেওয়া হয়।”
সাংসদ পুরকায়স্থ আরও বলেন, “সর্দার প্যাটেল বিশ্বাস করতেন ঐক্যবিহীন জনশক্তি প্রকৃত শক্তি নয়। সুশৃঙ্খল ঐক্যই জাতির আত্মার প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে ২০১৮ সালে উদ্বোধন করা Statue of Unity তাঁর এই আদর্শের প্রতীক, যা আজ ভারতের ঐক্যের প্রতিরূপ।”

তিনি আরও বলেন, “ভারতের ৫৬২টি দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করার পেছনে ছিল সর্দার প্যাটেলের অনন্য প্রশাসনিক মেধা, বাস্তববোধ ও দৃঢ়তা। তাঁর সাহসিকতা ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি না থাকলে আজকের ঐক্যবদ্ধ ভারত সম্ভব হতো না। প্যাটেলের উত্তরাধিকারই আজকের এই ঐক্যবদ্ধ, সার্বভৌম ভারত।”
এদিন তার ভাষনের সমাপ্তিতে সাংসদ কনাদ পুরকায়স্থ বলেন, “প্রত্যেক ভারতবাসীর উচিত কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততার পথে চলা। প্যাটেলের শৃঙ্খলা, সততা ও সেবার চেতনা আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রার পথপ্রদর্শক।”
শিলচর বিধায়ক দিপায়ন চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ছিলেন এমন এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক যিনি বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতের রাজনৈতিক সংহতির প্রধান স্থপতি ও জনসেবার প্রতীক।” বিধায়ক চক্রবর্তী বলেন, “ভারত আজও লৌহপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধায় নত। তাঁর নেতৃত্ব আজও আমাদের জাতীয় বিবেককে আলোকিত করে।”
তিনি আরও আহ্বান জানান, “এই স্মরণীয় দিনে আমাদের প্রত্যেকের উচিত জাতীয় ঐক্য ও সততার মূল্যবোধে নিজেদের পুনর্নিবেদিত করা। আমরা একত্রে প্যাটেলের স্বপ্নের ভারত শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও আত্মনির্ভর ভারত গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
উধারবন্দের বিধায়ক মিহির কান্তি সোম তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “সর্দার প্যাটেলের সাহস, দূরদৃষ্টি ও দৃঢ় সংকল্প আজও ভারতের অগ্রগতির দিশা দেখায়। তিনি ছিলেন সত্যিকারের ‘স্টিল ম্যান’, যার ঐক্য ও শৃঙ্খলার দর্শন আমাদের জাতির ভিতকে দৃঢ় করেছে। তরুণ সমাজের উচিত তাঁর সততা, দেশপ্রেম ও ঐক্যের চেতনা বয়ে নিয়ে যাওয়া।”
জেলা আয়ুক্ত, মৃদুল যাদব, (আইএএস) তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সর্দার প্যাটেলের জীবন হল শৃঙ্খলা, ঐক্য ও কর্তব্যনিষ্ঠ নেতৃত্বের এক অনন্ত দৃষ্টান্ত। স্বাধীন ভারতের প্রথম গৃহমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা (IAS) ও পুলিশ পরিষেবার (IPS) ভিত্তি স্থাপন করেন। এই কাঠামো আজও ভারতের গণতান্ত্রিক প্রশাসনের মূল স্তম্ভ।”
তিনি বলেন, “আজকের উদযাপন শুধুই ইতিহাস স্মরণ নয় এটি শান্তি, অগ্রগতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতির পুনর্নবীকরণ। আজ প্যাটেলকে স্মরণ করে আমরা তাঁর ঐক্য ও ন্যায়ের আদর্শে নিজেদের নতুন করে সমর্পিত করছি।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে মাই ভারতের ডেপুটি ডিরেক্টর মহেবুব আলম লস্কর তাঁর স্বাগত ভাষণে বলেন, “আজকের এই বিপুল জনসমাগমই প্রমাণ করে জাতীয় ঐক্যের শক্তি কতটা গভীর। আসাম সরকার, বিভিন্ন বিভাগ, এন এস এস, এন সি সি, স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস, ASLRM, NULM এবং প্রায় পঞ্চাশটি স্থানীয় ক্লাব ও এনজিওর সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠান এক মহোৎসবে রূপ নিয়েছে। এটি আসলে মাই ভারতের মূল চেতনা ঐক্য, তরুণশক্তির সম্মিলিত কর্মকাণ্ড ও সমাজসেবার প্রতীক।”
তিনি বলেন, “সর্দার প্যাটেলের মতো জাতীয় নায়কদের স্মরণ আমাদের তরুণ সমাজে নাগরিক চেতনা ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে।”
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুচরণ কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দেশাত্মবোধক গান, বিহু, ধামাইল ও মণিপুরী নৃত্য পরিবেশন করেন। Pathik Natya Sanstha ও সরলা বিড়লা জ্ঞান জ্যোতি স্কুলের শিক্ষার্থীরা একটি পথনাটিকায় সমাজে মাদকবিরোধী বার্তা ও জাতীয় মূল্যবোধ প্রচার করে।
এছাড়াও, কাছাড় জেলার বিভিন্ন মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী Swadeshi Mela–য় স্থানীয় হস্তশিল্প, তাঁতজাত পণ্য ও দেশীয় খাদ্য প্রদর্শন করে “Vocal for Local”–এর চেতনাকে আরও উজ্জীবিত করে। দর্শনার্থীদের বিপুল সাড়া ও প্রশংসা পায় এই প্রদর্শনী।
অনুষ্ঠানের শেষে সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য ও অন্যান্য অতিথিরা “এক পেড মা কে নাম” উদ্যোগে অংশ নেন। প্রতীকী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আয়ুক্ত ফিলিস হ্রাংচাল, হেমাঙ্গ নবিস, সহকারী আয়ুক্ত বহ্নিখা চেতিয়া, মাসি টোপনো, দীপা দাস এবং জেলা প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন শ্রী প্রসেনজিৎ ভট্টাচার্য, যিনি সকল দফতর, স্বেচ্ছাসেবক ও নাগরিকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান এই অনুষ্ঠানকে সফল করে তোলার জন্য।
