বন্ধুবরকে হারালাম প্রার্থনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য
রত্নজ্যোতি দত্ত
রবিবার সকালে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা দেখলাম।
বার্তায় শুধু লেখা ছিল :- “দাদা আর নেই।”
মুহূর্তেই বুকের ভিতর একটা ভয়ানক শূন্যতা নেমে এল!
আগের রাত থেকেই মন খুব অশান্ত ছিল – বন্ধুবর সঞ্জয় বিশ্বাস শিলচরের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিলো।
আমাদের দুজনের অভিন্ন বন্ধু হিরণ্ময় রায়, যিনি উত্তরাখণ্ডের একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, শনিবার রাতেই আমাকে সঞ্জয়ের সংকটজনক অবস্থার খবর দিয়েছিলো।
সঞ্জয়ের ছোট ভাই – জয়দীপ বিশ্বাস, দক্ষিণ আসামের একজন সুপরিচিত আইনজীবী—তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছে।
কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছে ছিল ভিন্ন!
সঞ্জয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় গুরুচরণ কলেজে স্নাতক পড়ার সময় থেকে। আসামের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি রাজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে আমরা আলাদা পথে চলে যাই। আমি গুয়াহাটিতে যাই অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পড়াশুনার জন্য আর সঞ্জয় চলে যায় অরুণাচল প্রদেশে, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে, যতদূর আমার মনে আছে।
সময়ের সাথে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও একে অপরের জীবনের গতিপথ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম। একসময় সঞ্জয় তাঁর প্রিয় স্ত্রীকে হারায়। তারপর সে ইটানগর থেকে একমাত্র সন্তান সোহম-কে নিয়ে শিলচরে ফিরে আসে। সোহম তাঁর স্নেহের ছায়ায় সুন্দরভাবে বড় হতে থাকে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে আসামের প্রান্তিক শহর শিলচর ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের প্রথম পোলো ক্লাবের জন্য বিখ্যাত।
সঞ্জয় নিষ্ঠার সাথে মা ও বাবা উভয়েরই ভূমিকাই পালন করে যাচ্ছিলো সোহমের জন্য।
যখনই শিলচর গেছি, সঞ্জয় সবসময় দেখা করতে এসেছে নিজের ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও। অনেক সময় সঙ্গে নিয়ে এসেছে সোহমকেও, যখন তার পড়াশোনার চাপ কম ছিল। ইদানিংকালে ছোট ছেলেটি কৈশোরে পা দিয়েছে ও পড়াশুনার চাপও বেড়েছে।
সঞ্জয় ছিল খুব মিশুক প্রকৃতির মানুষ। সে মানুষের সঙ্গে অতি সহজে সম্পর্ক তৈরি করতে পারতো। আমাদের কলেজ জীবনের বেশিরভাগ বন্ধুদের সঙ্গে সে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। আমিও বন্ধুদের খবরও তাঁর থেকেই পেতাম। সত্যিই, সে জানতো সম্পর্ককে কিভাবে যত্ন করে লালন করতে হয়।
এখন যখন সে প্রান্তিক শহরে যাব, জানি এক বর্ণনাতীত শূন্যতার মুখোমুখি হতে হবে বন্ধুবরের চির বিদায়ের জন্য।
যদি আমার প্রার্থনা সফল হতো, তাহলে আগামী সফরে আগের মতোই সঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা হতো। চুটিয়ে গল্প আর আড্ডা হতো।
আমি বিশ্বাস করি যারা সঞ্জয়কে চিনতো তারা সকলেই তাঁর অকালপ্রয়াণে সৃষ্ট সেই অপূরণীয় শূন্যতা অনুভব করছে। কারণ, সে ছিল আমাদের সবার বিশ্বাসের সংযোগসূত্র।
আজ সকালে জয়ের (আইনজীবী মহলে জয়দীপ বিশ্বাস নামে পরিচিত) সেই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা যেন মাথায় বজ্রাঘাত হানলো। এখন জয়কেই সোহমের কাকা এবং পিতা—দুই ভূমিকাতেই দাঁড়াতে হবে।
বিশ্বাস পরিবারকে প্রতিই রইলো আন্তরিক সমবেদনা—আর সোহমকে জানালাম অফুরন্ত ভালোবাসা।
আফসোস কিন্তু রয়ে গেলো।
ইশ্বর যদি প্রার্থনা অন্তত একটিবার শুনতেন !!
(লেখক দিল্লিস্থিত একজন বরিষ্ঠ সাংবাদিক।)
