গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে বিনয় অপরিহার্য: কুরেশি
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে এবং দেশের মানুষের সেবায় নিজেদের আরও কার্যকর করে তুলতে আমলাদের বিনয়ী হওয়া জরুরি। এমনই মন্তব্য করলেন ভারতের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ড. এস ওয়াই কুরেশি। নিজের প্রশাসনিক জীবনের শুরুর একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে কুরেশি জানান, এক মালী তাঁকে বিনয়ের এমন এক মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা তাঁর গোটা কর্মজীবনের পাথেয় হয়ে উঠেছিল।সেই ঘটনাই স্থান পেয়েছে তাঁর সদ্য প্রকাশিত বই ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড আই’-এ। একশোটি স্মৃতিচারণ নিয়ে লেখা এই গ্রন্থকে কুরেশি আত্মজীবনী বলতে নারাজ। তাঁর কথায়, এটি বরং এমন সব মানুষ ও অভিজ্ঞতার কথা, যাঁরা তাঁর জীবনবোধ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।
রাজধানীর ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে (আইআইসি) ২৪ জুলাই আয়োজিত বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে কুরেশি বলেন, জীবনের প্রথম দিকের সেই শিক্ষা আজও তাঁর পথপ্রদর্শক।
“সম্ভবত আমিই দেশের সবচেয়ে সহজলভ্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলাম,” বলেন তিনি। কুরেশি কথায়, জীবনের গোড়ার দিকেই অর্জিত মূল্যবোধই তাকে এমন হতে সাহায্য করেছে।
বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন রাজ্যসভার সদস্য তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কপিল সিব্বল। তাঁর কথায়, “এই বইয়ে লেখক নিজেকেই আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন।”
দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজের সহপাঠী কুরেশিকে স্মরণ করে সিব্বল বলেন, সততা, বিনয় এবং নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালন করে তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে নিজের জীবনে প্রতিফলিত করেছেন।
অনুষ্ঠানে অভিনেতা, সম্প্রচারক ও লেখক সুনীত ট্যান্ডন বইটির দুটি অধ্যায় থেকে অংশবিশেষ অনুষ্ঠানে পাঠ করেন। তার মধ্যে ছিল সেই অধ্যায়ও, যেখানে এক মালী তরুণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা কুরেশিকে বিনয়ের পাঠ দিয়েছিলেন। তিনি বইটির শেষ অধ্যায় থেকেও পাঠ করেন, যেখানে কুরেশি তাঁর প্রয়াত স্ত্রীকে আবেগঘন শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। নেপালি মূলের স্ত্রীকে তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিণী, সৌম্য ব্যক্তিত্বের এবং অসাধারণ মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ক্ষমতা ও পদমর্যাদা সম্পর্কে কুরেশির মন্তব্য, কোনও পদই স্থায়ী নয়। তাই তা কখনও অহংকারের কারণ হওয়া উচিত নয়।
“আপনি যত গুরুত্বপূর্ণ পদেই থাকুন না কেন, সব সময় মনে রাখতে হবে, সেই পদ চিরস্থায়ী নয়,” বলেন তিনি।
ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবার (আইএএস) প্রাক্তন কর্মকর্তা কুরেশি জানান, দীর্ঘ কর্মজীবনে তাকে খুব কম ক্ষেত্রেই সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
পাকিস্তান সফরের একটি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কুরেশি বলেন, রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই তার সঙ্গে ইমরান খানের সাক্ষাৎ হয়েছিল। সে সময় ইমরান বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করতেন।
“আমি তাঁকে বলেছিলাম, যে প্রতিষ্ঠান একদিন আপনাকে নির্বাচিত ঘোষণা করতে পারে, তার সমালোচনা না করাই ভালো,” বলেন কুরেশি। তাঁর এই মন্তব্যে সভায় হাসির রোল ওঠে।
কুরেশি জানান, বইটির একটি অধ্যায়ে গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দলের অপরিহার্য ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর পরিচালনার জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির আস্থা অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আলোচনা পরিচালনা করেন প্রবীণ সাংবাদিক রাজদীপ সারদেশাই। তিনি বলেন, মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একটি প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর প্রধান মোহন ভাগবতের সঙ্গে কুরেশির আলোচনার বিবরণ পড়তে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহী।
সভায় উপস্থিত এক অতিথি পাঠক মন্তব্য করেন, আরএসএস প্রধানের সঙ্গে সেই আলোচনার বিবরণ এই সংস্করণে রয়েছে, নাকি ভবিষ্যতের কোনও খণ্ডের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে, তা জানাও কম আগ্রহের বিষয় নয়।
আলোচনার এক পর্যায়ে সারদেশাই বলেন, অবসরের পর অনেক আমলাই অনেক বেশি খোলামেলা মত প্রকাশ করেন। জবাবে কুরেশি বলেন, চাকরিতে থাকাকালীন সরকারি কর্মচারীরা আচরণবিধির আওতায় থাকেন। সেই প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের বন্ধুদের উপলব্ধি করা উচিত।
দ্য ট্রিবিউন-এর প্রধান সম্পাদক জ্যোতি মালহোত্রার মতে, ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড আই’ শুধু এক প্রাক্তন আমলার স্মৃতিচারণ নয়, প্রশাসন, গণতন্ত্র ও জনজীবনের নানা দিক সম্পর্কে মূল্যবান অভিজ্ঞতার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।