রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা হিংসা নয়, পুলিশের ভিত্তি হোক আইনের শাসন: বিচারপতি ভুঁইয়া
পুলিশের দায়বদ্ধতা এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জল ভুঁইয়া বললেন, পুলিশের আনুগত্য, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং জবাবদিহি একমাত্র আইনের শাসনের প্রতি থাকা উচিত, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি নয়।
পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, ভুয়ো সংঘর্ষ, পুলিশের উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং মণিপুরের দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির প্রসঙ্গ তুলে বিচারপতি ভুঁইয়া বলেন, কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা পরস্পরের বিরোধী নয়।
প্রাক্তন আইপিএস আধিকারিক যশোবর্ধন আজাদের লেখা Policing the Republic বইটির প্রকাশ অনুষ্ঠানে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পুলিশ ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি ভুঁইয়া।
পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ সালে দেশে পুলিশি হেফাজতে ১৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪০।
বিচারপতি ভুঁইয়ার প্রশ্ন, “কোনও নাগরিককে পুলিশ গ্রেফতার করার মুহূর্তেই কি তাঁর বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটি চলে যায়? গ্রেফতার হলেই কি তাঁর জীবনধারণের অধিকার স্থগিত হয়ে যেতে পারে?”
ডি কে বসু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের শাসনে পরিচালিত একটি সভ্য সমাজে হেফাজতে মৃত্যু “সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলির অন্যতম”।
ভুয়ো সংঘর্ষের বিরুদ্ধেও সরব হন বিচারপতি ভুঁইয়া। প্রকাশ কদম বনাম রামপ্রসাদ বিশ্বনাথ গুপ্ত মামলার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভুয়ো সংঘর্ষকে সুপ্রিম কোর্ট আইনের শাসনের মূল চেতনার পরিপন্থী বলে স্পষ্ট করেছে।
তাঁর কথায়, “এনকাউন্টার-দর্শন আসলে একটি অপরাধমূলক দর্শন।” তাঁর মতে, ভুয়ো সংঘর্ষ আইনের শাসনের ভিতকেই দুর্বল করে দেয়।
মণিপুরের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিচারপতি ভুঁইয়া। রাজ্যটিকে “ভারতের রত্ন” বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মণিপুর প্রতিভাবান শিল্পী, বিদ্বান এবং ক্রীড়াবিদদের ভূমি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে হিংসা এবং অশান্তি থামছে না।
তিনি বলেন, পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী, অসম রাইফেলস এবং সেনার বিপুল উপস্থিতি সত্ত্বেও মণিপুরে শান্তি অধরা থেকে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
“নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির বিচারে সম্ভবত সবচেয়ে সুরক্ষিত রাজ্যগুলির একটি হওয়া সত্ত্বেও সেখানে শান্তি এখনও অধরা। মণিপুরের এই ট্র্যাজেডি আমাদের সকলের জন্য একটি শিক্ষা,” বলেন তিনি।
পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে বিচারপতি ভুঁইয়া ২০০৬ সালের প্রকাশ সিংহ মামলার রায়ের কথাও স্মরণ করান। তিনি বলেন, পুলিশের উপর রাজনৈতিক কার্যনির্বাহীর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ তাকে আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার হাতিয়ারে পরিণত করতে পারে। এর ফলে কর্তৃত্ববাদ বাড়ার পাশাপাশি গণতন্ত্রের ভিতও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিচারপতি ভুঁইয়া স্পষ্ট করে বলেন, “পুলিশের দায়বদ্ধতা, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং জবাবদিহি একমাত্র আইনের শাসনের প্রতি থাকা উচিত।”
তবে একই সঙ্গে পুলিশকর্মীদের প্রতিকূল কাজের পরিবেশের কথাও স্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সীমিত পরিকাঠামো, কর্মীর ঘাটতি এবং নানা সমস্যার মধ্যেও বহু পুলিশকর্মী সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন।
বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গ তুলে বিচারপতি ভুঁইয়া অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরৎচন্দ্র সিংহের ১৯৯১ সালের একটি বক্তৃতার কথাও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সমাজে অবক্ষয় দেখা দিলে তার প্রভাব কোনও একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; আইনসভা, প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থাও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না।
মানবাধিকার রক্ষা এবং কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা যে পরস্পরের পরিপন্থী নয়, তা-ও স্পষ্ট করে দেন বিচারপতি ভুঁইয়া।
তাঁর কথায়, “পুলিশি ব্যবস্থা এবং মানবাধিকার রক্ষা পরস্পরের বিরোধী নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন না করেও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা সম্ভব।”
ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতা ও কাজের ধরন থেকে বেরিয়ে এসে পুলিশকে আধুনিক, সংবেদনশীল এবং নাগরিককেন্দ্রিক বাহিনীতে পরিণত করার আহ্বান জানান তিনি।