প্রবৃত্তি
ডাঃ রাজেশ চৌধুরী
আমি কি নিজে চলি? নাকি আমার প্রবৃত্তিই আমাকে চালায়?
আমি যতই বিদ্বান হই, পণ্ডিত হই, ক্ষমতাবান হই, মানুষের কাছে যতই সম্মানিত বা প্রভাবশালী হই – একটি প্রশ্ন কি কখনও নিজেকে করেছি?
আমি কি সত্যিই নিজের ইচ্ছায় চলি?
নাকি আমার অজান্তেই কোনো প্রবৃত্তি আমাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?
প্রশ্নটি সহজ!
কিন্তু উত্তরটি ভয়ংকর কঠিন!
কারণ মানুষ নিজের ভুলকে অনেক সময় দেখতে পায়, কিন্তু নিজের প্রবৃত্তির দাসত্বকে দেখতে পায় না।
আমার বুদ্ধি আছে।
আমার শিক্ষা আছে।
আমার অভিজ্ঞতা আছে।
আমার বিবেক আছে।
তবু কেন এমন কিছু করি, যা আমি নিজেই জানি আমার জন্য ক্ষতিকর?
কেন এমন কিছুর পেছনে ছুটি, যা পাওয়ার পরও আমার তৃপ্তি আসে না?
কেন বারবার সেই একই ভুল করি?
কেন বুঝতে পারি – এই পথ আমাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তবু সেই পথ থেকে ফিরে আসতে পারি না?
কারণ অনেক সময় আমি প্রবৃত্তিকে চালাই না; প্রবৃত্তিই আমাকে চালায়।
ঠিক যেন একজন মানুষকে ভূতে ধরেছে। সে নিজেই বুঝতে পারে না যে সে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।
টাকা – কতটা প্রয়োজন, আর কতটা নেশা?
অর্থের প্রয়োজন আছে,বৈকি!
ভালোভাবে বাঁচতে অর্থ প্রয়োজন। পরিবার চালাতে অর্থ প্রয়োজন। চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা—সবকিছুর জন্য অর্থ প্রয়োজন।
যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, পরিশ্রম ও সেবাবুদ্ধির মাধ্যমে বেশি অর্থ উপার্জন হলে তাতে দোষ নেই।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় অন্য জায়গায়।
যখন অর্থ আমার প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে আমার জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।
আরও চাই।
আরও চাই।
আরও চাই।
কেন চাই, কতটা চাই – তার উত্তর নেই।
টাকাতেই আনন্দ।
টাকাতেই নিরাপত্তা।
টাকাতেই সাফল্য।
তখন পরিবার অপেক্ষা করে।
শরীর অপেক্ষা করে।
ইষ্টকর্ম অপেক্ষা করে।
আত্মশুদ্ধি অপেক্ষা করে।
কিন্তু টাকা অপেক্ষা করে না।
সারাদিনের ব্যস্ততা শুধু অর্থের জন্য।
সততা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে – তবু চলবে।
বিবেক আপস করতে বলছে – তবু চলবে।
ইষ্টের কথা মনে পড়ছে না – তবু চলবে।
এই জায়গাতেই Money Complex-এর ভয়ংকর রূপ।
অর্থ তখন আর আমার উপকরণ নয়;
আমি অর্থের উপকরণ হয়ে যাই।
কামনা – আমি কি ভালোবাসি, নাকি ভোগ করতে চাই?
নারী-পুরুষের সম্পর্ক জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
ভালোবাসা, দাম্পত্য, স্নেহ, দায়িত্ব- এসব মানুষের জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজন।
কিন্তু যখন সম্পর্কের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় কেবল কামনা, ভোগ ও নিজের আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি, তখন সেই সম্পর্কও প্রবৃত্তির হাতে বন্দি হয়ে যেতে পারে।
তখন মানুষটি আর মানুষ থাকে না।
সে হয়ে ওঠে আমার কামনার একটি মাধ্যম।
তার মন জয় করতে হবে।
তাকে খুশি রাখতে হবে।
তার স্বীকৃতি চাই।
তার মাধ্যমে নিজের বাসনা পূর্ণ করতে হবে।
এই আকর্ষণ যখন বিবেক, দায়িত্ব, আদর্শ ও আত্মসংযমকে অতিক্রম করে যায়, তখন মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের স্বাধীনতা হারাতে শুরু করে।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব মানুষের বন্ধনের প্রসঙ্গে কামনা ও অর্থের আসক্তির কথা বারবার বলেছেন। তাঁর শিক্ষায় মূল বিষয় ছিল – মন কোন দিকে বাঁধা পড়ে আছে, সেটিই মানুষের বন্ধনের একটি প্রধান কারণ।
ক্ষমতা – আমি কি সেবা করতে চাই, নাকি সবাইকে নিজের অধীনে চাই?
মানুষকে সাহায্য করতে ভালো লাগে।
মানুষের সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে।
কাজ করতে ভালো লাগে।
এগুলো স্বাভাবিক।
কিন্তু একসময় মনে হতে পারে,
“আমাকেই নেতা হতে হবে।”
“সবাই আমার কথা শুনবে।”
“আমাকে ছাড়া কিছু হবে না।”
“আমিই সর্বেসর্বা।”
এখানেই Power Complex মাথা তুলতে পারে।
ক্ষমতা পাওয়ার জন্য তখন শুরু হয় হিসাব।
কে আমার লোক?
কে আমার বিরোধী?
কাকে কাছে রাখবো?
কাকে তাড়াবো?
কীভাবে আমার প্রভাব বাড়বে?
কীভাবে সবাই আমাকে মানবে?
এমনকি ধর্মের ক্ষেত্রেও এই প্রবৃত্তি ঢুকে পড়তে পারে।
ইষ্টকাজ করছি – কিন্তু ভিতরে ভিতরে চাইছি, “আমাকে সবাই চিনুক।”
সেবা করছি – কিন্তু চাইছি, “আমার নাম হোক।”
সংগঠনে কাজ করছি – কিন্তু চাইছি, “আমিই নেতা হই।”
তখন ইষ্ট সামনে থাকেন, কিন্তু নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার বাসনা ভিতরে ভিতরে ইষ্টের জায়গা দখল করে নেয়।
এটাই বিপজ্জনক।
খাদ্য – আমি কি খাবার খাই, নাকি খাবার আমাকে খায়?
খাবার প্রয়োজন।
রুচিকর খাবার ভালো লাগাও স্বাভাবিক।
কিন্তু এমন কোনো খাদ্য বা পানীয়ের প্রতি যদি এমন আসক্তি তৈরি হয় যে ক্ষতি জানার পরও নিজেকে থামাতে পারি না, তখন প্রশ্ন করা দরকার—
আমার ইচ্ছাশক্তি কোথায়?
আমি জানি ক্ষতি হচ্ছে।
আমি জানি শরীর খারাপ হচ্ছে।
আমি জানি অভ্যাসটি আমাকে দুর্বল করছে।
তবু থামতে পারছি না।
অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে?
আমি, নাকি আমার প্রবৃত্তি?
শ্রীশ্রীঠাকুরের অনুসারী হিসেবে আরও একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করতে হয়।
আমি তাঁর নির্দেশ জানি।
আমি তাঁর আদর্শ জানি।
কিন্তু আমার জীবনযাপনে তার প্রতিফলন কতটা?
শুধু জানা কি যথেষ্ট?
জানা আর সেই জ্ঞান অনুযায়ী চলা – এক জিনিস নয়।
সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রবৃত্তি – আত্মপ্রতিষ্ঠা
এটি হয়তো সবচেয়ে সূক্ষ্ম।
আমি মানুষের সেবা করছি।
আমি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি।
আমি ধর্মের কাজ করছি।
আমি ইষ্টের কাজ করছি।
সবই ভালো।
কিন্তু হঠাৎ নিজেকে একটু জিজ্ঞাসা করি –
“মানুষ আমাকে না জানলে, কেউ আমার প্রশংসা না করলে, আমার নাম না হলে – আমি কি একই কাজটি করব?”
উত্তরটি যদি অস্বস্তিকর হয়, তবে বুঝতে হবে কোথাও একটা প্রবৃত্তি কাজ করছে।
আমি চাই মানুষ বলুক –
“কী ভালো মানুষ!”
“কী বড় সমাজসেবক!”
“কী বড় ভক্ত!”
“কী অসাধারণ কর্মী!”
তখন সেবা ধীরে ধীরে ইষ্টের জন্য না হয়ে নিজের পরিচয়ের জন্য হয়ে যেতে পারে।
এখানেই আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রবৃত্তি।
তাহলে মুক্তি কোথায়?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আমি যদি নিজের প্রবৃত্তিকেই চিনতে না পারি, তাহলে তার হাত থেকে মুক্ত হব কীভাবে?
শুধু বুদ্ধি দিয়ে?
শুধু বই পড়ে?
শুধু বক্তৃতা শুনে?
শুধু সংকল্প করে?
কিছুটা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিনের গভীর প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে শুধু নিজের শক্তি দিয়ে লড়াই করা অনেক সময় কঠিন।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন, “মনই বন্ধন এবং মনই মুক্তি।” তিনি আরও বলেছেন, মন যে রঙে রঞ্জিত হয়, সেই রঙই ধারণ করে; অসৎ সঙ্গ মনকে একদিকে নেয়, আর ভক্তদের সঙ্গ ঈশ্বরচিন্তার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ মনকে শুধু খালি করে রাখলে হবে না।
মনকে একটি উচ্চতর আশ্রয় দিতে হবে।
প্রবৃত্তির টানকে শুধু “না” বলে থামানো কঠিন।
তার চেয়ে বড় কোনো টান চাই।
ছোট আকর্ষণকে সরাতে বড় আকর্ষণ চাই।
ছোট বন্ধনকে আলগা করতে শক্তিশালী উচ্চতর বন্ধন চাই।
তাই প্রয়োজন ইষ্টের প্রতি গভীর টান
আমি যদি সত্যিই প্রবৃত্তির হাত থেকে বাঁচতে চাই, তবে আমাকে নিজের জীবনকে একটি উচ্চতর আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
ইষ্টের প্রতি ভালোবাসা বাড়াতে হবে।
ইষ্টের আদর্শকে জীবনের কেন্দ্রে আনতে হবে।
ইষ্টের কাজকে নিজের স্বার্থের উপরে রাখতে হবে।
ইষ্টের নির্দেশকে নিজের সুবিধার সঙ্গে তুলনা করা বন্ধ করতে হবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা –
নিজেকে প্রতিদিন পরীক্ষা করতে হবে।
আজ আমি যে কাজটি করলাম, কেন করলাম?
ইষ্টের জন্য?
নাকি নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য?
আমি যে অর্থ উপার্জন করছি, কেন করছি?
প্রয়োজনের জন্য?
নাকি অর্থই আমার জীবনের কেন্দ্র হয়ে গেছে?
আমি যে সম্পর্কটি ধরে রেখেছি, সেখানে ভালোবাসা বেশি?
নাকি অধিকারবোধ ও কামনা বেশি?
আমি যে সংগঠনের কাজ করছি, সেখানে ইষ্ট বড়?
নাকি আমি বড় হতে চাই?
আমি যে ধর্মচর্চা করছি, সেখানে আত্মশুদ্ধি হচ্ছে?
নাকি নিজের পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠছে?
প্রবৃত্তিকে জয় করার প্রথম ধাপ – নিজেকে দেখা
প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয় অন্যকে দেখে নয়।
নিজেকে দেখে।
অন্যের Money Complex দেখতে পাওয়া সহজ।
অন্যের Power Complex চোখে পড়ে।
অন্যের অহংকার আমরা সহজেই ধরতে পারি।
কিন্তু নিজের প্রবৃত্তি?
সেখানে আমরা আশ্চর্য রকম অন্ধ।
তাই প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার –
“আজ আমাকে কে চালিয়েছে?”
আমার বিবেক?
আমার আদর্শ?
আমার ইষ্ট?
নাকি আমার প্রবৃত্তি?
জীবনের শেষ হিসাব
জীবন খুব দীর্ঘ মনে হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সময় খুব অল্প।
সারাজীবন আমরা কতকিছু অর্জন করি।
অর্থ অর্জন করি।
পরিচিতি অর্জন করি।
ক্ষমতা অর্জন করি।
প্রশংসা অর্জন করি।
ভোগ অর্জন করি।
কিন্তু একদিন যখন জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকাই, তখন একটি প্রশ্নই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—
“আমি আসলে কী পেলাম?”
যে অর্থের জন্য জীবন কাটালাম, তা কি আমাকে শান্তি দিল?
যে ক্ষমতার জন্য ছুটলাম, তা কি আমাকে মুক্ত করল?
যে ভোগের পেছনে ছুটলাম, তা কি আমাকে পরিপূর্ণ করল?
যে খ্যাতি চাইলাম, তা কি আমার অন্তরকে পূর্ণ করল?
নাকি সারাজীবন এক প্রবৃত্তি থেকে আরেক প্রবৃত্তির পেছনে ছুটে বেড়ালাম?
তখন হয়তো বুঝব—
আমি জীবনকে পরিচালনা করিনি।
আমার প্রবৃত্তিই আমাকে পরিচালনা করেছে।
তাই আজ থেকেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করি –
আমি কি আমার প্রবৃত্তির মালিক?
নাকি প্রবৃত্তিই আমার মালিক?
আর যদি দেখি – আমি এখনও প্রবৃত্তির হাতে বন্দি, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
কারণ নিজের বন্ধনকে চিনতে পারাই মুক্তির প্রথম দরজা।
তারপর প্রয়োজন সেই উচ্চতর আশ্রয়, সেই জীবন্ত আদর্শ, সেই ইষ্টের প্রতি এমন গভীর ভালোবাসা – যার টানে আমার ছোট ছোট আকর্ষণগুলি একদিন আপনিই তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে।
তখন জীবন আর শত দিকের দিকে ছুটবে না।
একটি কেন্দ্র পাবে।
একটি উদ্দেশ্য পাবে।
একটি আশ্রয় পাবে।
আর তখন হয়তো জীবনের শেষ হিসাবের দিন বলতে পারব –
“আমি অনেক কিছু পাইনি,
কিন্তু যাঁকে পাওয়ার জন্য জীবন পেয়েছিলাম,
তাঁর পথ থেকে সরে যাইনি।”
সেই পাওয়াই তো জীবনের আসল পাওয়া।।