প্রশাসনিক সীমানা নয়, বন্ধুত্বের সেতুবন্ধনই হোক দুই রাজ্যের পরিচয়, সাড়ম্বরে সম্পন্ন বর্ণাঢ্য আয়োজনে সীমান্ত উৎসব, ব্যাপক সাড়া
জনসংযোগ, শিলচর ৩০ অক্টোবর: মিজোরামের ভাইরেংতেতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অসম-মিজোরাম সীমান্ত উৎসব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও নিবিড় করার ডাক জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক শীর্ষ আধিকারিকদের।
প্রশাসনিক সীমানা কখনও যেন দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ভৌগোলিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক আস্থা, সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান এবং সৌহার্দ্যের সম্পর্ক আরও মজবুত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শুক্রবার মিজোরামের ভাইরেংতেতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হল অসম-মিজোরাম আন্তঃরাজ্য সীমান্ত উৎসব। দুই রাজ্যের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যেই এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।
মিজোরাম ও অসম সরকারের যৌথ উদ্যোগে, কোলাসিব ও কাছাড় জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় মিজোরামের ভাইরাংতেতে জয়েন্ট ওয়াইএমএ মাঠে আয়োজিত এই উৎসবে দুই রাজ্যের জনপ্রতিনিধি, শীর্ষ প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিক, ক্রীড়াবিদ, সাংস্কৃতিক দলের সদস্য এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে এক মিলনমেলায় পরিণত করে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার যে বন্ধন দুই রাজ্যের মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে, উৎসবের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারই প্রতিফলন দেখা যায়।
অনুষ্ঠানের যৌথ সভাপতিত্ব করেন কোলাসিবের অতিরিক্ত জেলাশাসক বি. মালসাওমতলুয়াঙ্গি এবং ডিআরডিও এর প্রকল্প অধিকর্তা পু লালমুয়ানপুইয়া। অসমের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ধলাইয়ের বিধায়ক অমিয় কান্তি দাস। দলের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্তা, আইএএস,সিনিয়র পুলিশ সুপার পার্থপ্রতিম দাস, আইপিএস সহ দুই জেলার অন্যান্য আধিকারিক, ক্রীড়াবিদ ও সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মিজোরাম বিধানসভার উপাধ্যক্ষ তথা কোলাসিবের বিধায়ক লালফামকিমা আশা প্রকাশ করেন, এই সীমান্ত উৎসব দুই রাজ্যের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও নিবিড় ও সুদৃঢ় করে তুলবে। তিনি বলেন, প্রশাসনিক সীমানা কখনও বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথে অন্তরায় হওয়া উচিত নয়। জীবনযাত্রা, সামাজিক রীতিনীতি, ঐতিহ্য কিংবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে দুই রাজ্যের মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তার কোনও প্রভাব যেন প্রতিবেশী দুই রাজ্যের মানুষের দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে না পড়ে।
সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বাণিজ্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই রাজ্যের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের বৃহত্তর স্বার্থে দুই জেলার প্রশাসন, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগগুলিকে সমন্বয়ের ভিত্তিতে একযোগে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও স্বার্থান্বেষী মহলের কার্যকলাপ সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অপপ্রচার বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কার্যকলাপ দুই রাজ্যের মধ্যে বর্তমান শান্তিপূর্ণ সম্পর্ককে বিঘ্নিত করতে পারে। কৃষক সমাজ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আরও নিবিড় যোগাযোগ ও সমন্বয় গড়ে উঠলে দুই রাজ্যের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত আরও শক্তিশালী হবে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ধলাইয়ের বিধায়ক অমিয় কান্তি দাস এই উৎসবকে অসম ও মিজোরামের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন শুধু দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে সুসম্পর্ককেই উৎসাহিত করে না বরং সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐক্য, সংহতি ও সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আন্তঃরাজ্য সীমান্ত এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি দুই রাজ্যের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিসর আরও বিস্তৃত করতে এই উৎসব আগামী দিনেও ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এর আগে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্তা আইএএস, অসম ও মিজোরামের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং দীর্ঘদিনের নিবিড় যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এমন দুটি শক্তিশালী মাধ্যম যা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত মজবুত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব তরুণ সমাজের উপরেই বর্তায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সীমান্ত সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যার সমাধানে সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের উপর গুরুত্ব আরোপ করে জেলা আয়ুক্ত তরুণ প্রজন্মের প্রতি দুই রাজ্যের মধ্যে বর্তমান সুসম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা এবং তাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকলেই সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে।
কোলাসিবের পুলিশ সুপার লালরিনপুইয়া ভার্তেও এই উৎসবকে দুই রাজ্যের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। মাদক পাচার এবং অন্যান্য বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধে কোলাসিব পুলিশ ও অসম পুলিশের মধ্যে বর্তমান কার্যকর সমন্বয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি বজায় রাখা এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ রুখতে দুই রাজ্যের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করার উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ডিআরডিও-র প্রকল্প অধিকর্তা লালমুয়ানপুইয়া এবং ভাইরেংতের মহকুমাশাসক (সিভিল) ডঃ স্যামুয়েল লালমালসাওমা সাইলো।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কাছাড় ও কোলাসিবের শিল্পীদের পরিবেশিত বর্ণময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দুই অঞ্চলের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তাঁদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। সঙ্গীতানুষ্ঠান উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। পাশাপাশি ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস ও ভলিবল প্রতিযোগিতায় দুই রাজ্যের খেলোয়াড়রা অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের পাশাপাশি পারস্পরিক বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশে এই ক্রীড়া কর্মসূচিগুলি অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় উৎপাদিত সামগ্রী ও গ্রামীণ উদ্যোগকে তুলে ধরতেও উৎসব প্রাঙ্গণে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। এটিএমএ (ATMA) এবং মিজোরাম স্টেট রুরাল লাইভলিহুডস মিশন (MzSRLM)-এর উদ্যোগে বিভিন্ন স্টল খোলা হয়। সেখানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সামগ্রী প্রদর্শনের পাশাপাশি অঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোগ, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যের পরিচিতি বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
অসমের পক্ষ থেকে শিলচর ওয়াইএমএ-র প্রতিনিধিরাও উৎসবে যোগ দেন। তাঁদের নেতৃত্ব দেন শিলচর ডিআরসি-র লালহমিংলিয়ানা।
দিনভর নানা কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। অনুষ্ঠানের শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কোলাসিবের জেলাশাসক এইচ. ডোলিয়ানবুয়াইয়া।