যশপাল রানার উত্তরাধিকার, পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে উদ্যোগ
১৬ সেপ্টেম্বর :- কিংবদন্তি শুটার যশপাল রানার নামে এশিয়ান গেমসের সেরা মহিলা ক্রীড়াবিদের জন্য ‘যশপাল রানা মেমোরিয়াল ট্রফি’ চালু করবে ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (IOA)। ভারতীয় শুটিংয়ে রানার অবদান এবং কোচ ও মেন্টর হিসেবে তাঁর ভূমিকার উত্তরাধিকারকে আগামী প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে যুক্ত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। রানার জীবন ও কেরিয়ার নিয়ে এস কান্নান এবং জি রাজরামনের লেখা ‘Maverick Jaspal’ বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার এই ঘোষণা করেন IOA সভাপতি পি টি ঊষা। তিনি বলেন, রানাকে শুধু তাঁর নিজের জেতা পদকের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের চ্যাম্পিয়ন তৈরিতে তাঁর অবদানের জন্যও স্মরণ করা উচিত। “স্মৃতি, যতই মূল্যবান হোক, একটি প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু উত্তরাধিকার পরের প্রজন্মের,” বলেন ঊষা। বইটি রানাকে শুধু একজন চ্যাম্পিয়ন শুটার হিসেবে নয়, কোচ, মেন্টর, সহকর্মী এবং বন্ধু হিসেবেও তুলে ধরেছে বলে জানান তিনি। প্রয়াত রানা ছিলেন ভারতের অন্যতম সফল শুটার। প্রতিযোগী হিসেবে সাফল্যের পরে কোচ ও মেন্টর হিসেবেও ভারতীয় শুটিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। ঊষার কথায়, রানার সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো তাঁর নিজের জেতা পদকের সংখ্যায় নয়, বরং যে ক্রীড়াবিদদের তিনি তৈরি করেছিলেন তাঁদের সাফল্যে। তিনি এ বছর জুন মাসে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। “এক জন ক্রীড়াবিদ হিসেবে পদকে নাম থাকে। কিন্তু কোচ হিসেবে পদক অন্য কারও নামে থাকে – তবু সেই পদকের মধ্যে কোচের একটা অংশ থেকে যায়,” বলেন তিনি। রানার জীবনযাত্রার সমাপ্তি অকালেই হয়েছে বলে উল্লেখ করে ঊষা বলেন, ভারতীয় ক্রীড়ায় তাঁর প্রভাব আগামী প্রজন্মের মধ্য দিয়ে আরও এগিয়ে যাবে। “যশপালের যাত্রা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার এখানেই শেষ হচ্ছে না। বরং ভারতের পরবর্তী প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের হাত ধরে তা আবার শুরু হচ্ছে,” বলেন তিনি। রানার সঙ্গে মনু ভাকেরের সম্পর্কের কথাও বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন ঊষা। প্যারিস অলিম্পিক্সে ২০২৪ সালে ভাকেরের সাফল্যের পিছনে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা এবং কঠোর পরিশ্রমের কথা তুলে ধরেন তিনি। অলিম্পিক্সের সাফল্যের পরে ভাকেরকে জড়িয়ে রানার একটি ছবির কথাও স্মরণ করেন ঊষা। তাঁর মতে, সেই ছবিতে কঠোর কোচের আড়ালে থাকা রানার গর্ব, স্বস্তি এবং স্নেহ ফুটে উঠেছিল। যশপাল রানা ভারতের অন্যতম কৃতী শুটার এবং ভারতীয় শুটিং জগতের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীতে ১৯৭৬ সালে জন্মগ্রহণকারী রানা অল্প বয়সেই শুটিং শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি ২৫ মিটার পিস্তল এবং ২৫ মিটার স্ট্যান্ডার্ড পিস্তল বিভাগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। রানা এশিয়ান গেমসে তিনটি সোনা জয় করেছেন – ১৯৯৪ সালের হিরোশিমা এশিয়ান গেমসে ২৫ মিটার সেন্টার-ফায়ার পিস্তল বিভাগে এবং ২০০৬ সালের দোহা এশিয়ান গেমসে ২৫ মিটার সেন্টার-ফায়ার পিস্তল ও ২৫ মিটার স্ট্যান্ডার্ড পিস্তল বিভাগে সোনা জয় করেন। “তিনি তাঁর ক্রীড়াবিদদের জন্য ভাবতেন। ভারতীয় শুটিংয়ের জন্য ভাবতেন। ভারতের হয়ে পদক জেতার জন্য ভাবতেন,” বলেন ঊষা। IOA একই সঙ্গে এশিয়ান গেমসের সেরা পুরুষ ক্রীড়াবিদের জন্য রাজা রণধীর সিং মেমোরিয়াল ট্রফি চালু করবে। ঊষা বলেন, দুই পুরস্কারের মাধ্যমে ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখা দুই ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানো হবে। রাজা রণধীর সিংহ ছিলেন ভারতের অলিম্পিক আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। একদিকে তিনি ছিলেন কৃতী শুটার ও পাঁচবারের অলিম্পিয়ান, অন্যদিকে প্রায় চার দশক ধরে ক্রীড়া প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০২৬ সালের ২৭ মে, ৭৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে যশপাল রানা ট্রফির বিশেষ তাৎপর্য হল, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একজন ‘চ্যাম্পিয়ন-মেকার’-এর গল্প পৌঁছে দেবে।ঊষার কথায়, আগামী দিনে কোনও এশিয়ান গেমস চ্যাম্পিয়ন যখন এই ট্রফি হাতে নিয়ে জানতে চাইবেন, “যশপাল রানা কে ছিলেন?”, তখনই এই উদ্যোগের আসল উদ্দেশ্য সফল হবে। “হয়তো তারা যশপালকে চিনতেন না। হয়তো রাজা জি-র সঙ্গেও তাঁদের কখনও দেখা হয়নি। কিন্তু তাঁরা প্রশ্ন করবেন – যশপাল রানা কে ছিলেন? কেন এই ট্রফির নাম তাঁর নামে? তখন কেউ তাঁদের বলবেন,” বলেন ঊষা। “এই ভাবেই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা যায় – শুধু ছবি বা বইয়ের মধ্যে নয়, তাঁদের পরে যারা আসবে, তাদের স্বপ্ন এবং সাফল্যের মধ্যে ও যেন বাস্তবায়ন পায় পরবর্তী প্রজন্ম” এই উদ্যোগ তেমনটাই বুঝিয়ে দিল।”


