বই প্রকাশের সন্ধ্যায় কিছু অনুভূতি
শিলচরের সাংস্কৃতিক পরিসরে কিছু কিছু সন্ধ্যা নিছক একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—সেগুলি হয়ে ওঠে স্মৃতি, সৃজন ও সম্পর্কের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সন্ধ্যাটি আমার কাছে তেমনই একটি স্মরণীয় সন্ধ্যা।মধ্যশহর সাংস্কৃতিক সংস্থার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সভাকক্ষে ব্যতিক্রমী প্রকাশনা সংস্থা নতুন দিগন্ত প্রকাশনী-র বার্ষিক মিলন অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে মোড়ক উন্মোচিত হল তিনটি গ্রন্থের। প্রকাশনীর কর্ণধার মিতা দাসপুরকায়স্থের ‘দেশকাল দিগন্ত’, আমার দুই সুজন আশুতোষ দাসের ‘সৃষ্টি বাউলের আত্মকথা’ এবং অমিত সিকদারের ‘শিলচর: সেই সময়’—গুণীজনদের হাতে একে একে উন্মোচিত হল তিনটি বইয়ের প্রচ্ছদ।উপস্থিত ছিলেন বরাক উপত্যকার তিন জেলার প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কণ্ঠশিল্পী ও সংস্কৃতিমনস্ক বহু মানুষ। কিন্তু অনুষ্ঠানটি কেবল বই প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতায় আটকে থাকেনি। গান, কবিতা ও কথনের মধ্য দিয়ে সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছিল এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আসর। বরাকে আরও দু-একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থাকলেও বই প্রকাশকে কেন্দ্র করে এমন মিলনোৎসবের আয়োজন সত্যিই বিরল। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সকলের জন্য প্রকাশনীর পক্ষ থেকে মিতা দাসপুরকায়স্থের আন্তরিক নৈশ আহারের ব্যবস্থাও ছিল। সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটি ছিল আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমাবেশ।তবে এদিনের অনুষ্ঠান আমার কাছে ছিল একটু বেশি পাওয়ার, একটু বেশি আপন।আমার অতি শ্রদ্ধার আশুতোষ দাস—আমাদের আশুদা তাঁর ‘সৃষ্টি বাউলের আত্মকথা’ গ্রন্থটি যাঁদের উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের কয়েকজনের মধ্যে আমাকেও রেখেছেন। বইটির উৎসর্গপত্রে যাঁদের নাম তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে পণ্ডিত, কৃতী ও নমস্য মানুষ। তাঁদের পাশে আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের নাম দেখে এক মুহূর্তের জন্য নিজের কাছেই কেমন যেন অপ্রস্তুত লেগেছে। মনে হয়েছে—এ কি সত্যিই আমার প্রাপ্য?আশুদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেই নব্বইয়ের দশক থেকে। প্রথমে আমি তাঁর একজন গুণমুগ্ধ পাঠক; পরে ধীরে ধীরে সেই পাঠকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক আন্তরিক স্নেহের সম্পর্ক। তিনি আমাকে বরাবরই স্নেহ করেছেন। আমার কাজকর্মে উৎসাহ দিয়েছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন। কখনও দু-একটি কথা, কখনও একটি ফোন, কখনও নিঃশব্দ সমর্থন—তাঁর এই স্নেহ আমার পথচলায় বহুবার সাহস জুগিয়েছে।এবার তাঁর বই উৎসর্গের মধ্য দিয়ে সেই স্নেহ যেন নতুন এক অর্থ পেল। মনে হল, সম্পর্কের কিছু ঋণ কাগজে-কলমে মাপা যায় না। কিছু সম্পর্কের কোনও সংজ্ঞা হয় না, কোনও হিসাবও থাকে না। তাই মনে হল—“স্নেহ অতি বিষম বস্তু!”আশুদার ‘সৃষ্টি বাউলের আত্মকথা’ শুধু একজন লেখকের আত্মজীবনের পাতা নয়; এটি তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার এক অন্তরঙ্গ দলিল। জীবনের নানা বাঁক, সৃষ্টির নেপথ্যকথা, অভিজ্ঞতার আলো-আঁধারি এবং সময়ের নানা অনুষঙ্গ তিনি অকপট ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন। ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র, নাটক, গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও আলোচনার বিচিত্র পরিসরে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততার নানা অধ্যায় এই গ্রন্থে ধরা পড়েছে।দূরদর্শনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ প্রচারিত ও আলোচিত হয়েছে। কিন্তু একজন স্রষ্টার জীবনের সব গল্প তো আর আলোয় আসে না। সৃষ্টির পেছনে থেকে যায় অসংখ্য নীরব অধ্যায়, ব্যক্তিগত স্মৃতি, সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা ও অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতা। ‘সৃষ্টি বাউলের আত্মকথা’ সেই অনালোচিত পরিসরেরও দরজা খুলে দেয়।ঔপন্যাসিক, কবি, গল্পকার, আলোচক—বহু পরিচয়ে আশুতোষ দাস নিজেকে মেলে ধরেছেন। তাঁর সৃষ্টির পরিসর বহুমাত্রিক। কবিতায় আবেগের সঙ্গে মিশেছে কাব্যরসের নান্দনিকতা; উপন্যাসে বরাক উপত্যকার ইতিহাস, সমাজ ও জীবন সহজ-স্বচ্ছ ভাষায় পেয়েছে স্বতন্ত্র কাহিনিরূপ। গল্পে এসেছে মানুষ, জীবন, সমাজ এবং মানুষের অন্তর্জগতের নানা সূক্ষ্ম অনুষঙ্গ। আর চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রয়েছে।এই আত্মকথার আরেকটি বড় সৌন্দর্য তার বয়ানে। একটি ঘটনা কখনও গল্পের মতো, কোনও স্মৃতি কখনও উপন্যাসের অধ্যায়ের মতো, আবার কোনও সৃষ্টির জন্মকথা কখনও সময়ের জীবন্ত আলোকচিত্রের মতো পাঠকের সামনে এসে দাঁড়ায়। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়, পাঠক যেন একজন স্রষ্টার পাশে পাশে হাঁটছেন—কখনও তাঁর জীবনের পথে, কখনও তাঁর সৃষ্টির ভিতরে, আবার কখনও সৃষ্টির নেপথ্যের অন্ধকার-আলোয়।অনুষ্ঠানে আশুদার সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমার শিক্ষাগুরু এবং আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বরাক উপত্যকার গর্ব ড. তপোধীর ভট্টাচার্য যথার্থই মন্তব্য করেন—আশুতোষ দাস বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন লেখক। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি সাবলীল; পাশাপাশি তিনি একজন সফল চিত্রনির্মাতাও।এই কথাগুলি শুনতে শুনতে আমার নিজেরও মনে হচ্ছিল—আশুদা শুধু একজন লেখক নন, তিনি বরাকের সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও সৃষ্টিশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর দীর্ঘ পথচলা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সময়, আমাদের সমাজ এবং আমাদের উপত্যকার সাংস্কৃতিক জীবনও।আশুদা, তোমার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।তোমার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ জীবন এবং নিরন্তর সৃষ্টিশীলতা কামনা করি। কারণ তুমি শুধু আমাদের প্রিয়জন নও—তুমি বরাকের সাহিত্য- সংস্কৃতির সম্পদ। বরাকবাসী তোমার আরও সৃষ্টি চায়, তোমার কলম ও ক্যামেরা থেকে আরও অনেক গল্প, আরও অনেক জীবন, আরও অনেক সময়ের দলিল পেতে চায়।‘সৃষ্টি বাউলের আত্মকথা’ পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নিক—এই শুভকামনা রইল।বইয়ের সাফল্য কামনা করি।আশুদার সৃষ্টির পথ আরও দীর্ঘ হোক—এই প্রার্থনা।