নানা পাটেকার মানুষ কে কাঁদিয়েছে, ব্যর্থ করেছে চিকিৎসক ও বিজ্ঞান ব্যবস্থাকে
নানা পাটেকরকে বাঁচিয়ে তুলতে একটানা ৪৫ মিনিট CPR দেওয়া হয়: এই CPR কী? কখন দেওয়া হয়? হার্ট অ্যাটাক হলে বাড়িতেই কী ভাবে দেবেন CPR? কতক্ষণ দেওয়া উচিৎ?
সংবাদ সংস্থা, ০৯ অক্টোবর :- চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধারণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, হাসপাতাল বা চিকিৎসকের বাইরে সাধারণ ক্ষেত্রে যতক্ষণ না পর্যন্ত জরুরি অ্যাম্বুল্যান্স বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী আসছেন, ততক্ষণ সিপিআর বন্ধ করা উচিত নয়।
বৃহস্পতিবার সকালে নেমে এল বিরাট দুঃসংবাদ। উৎসবের আবহে কেউ প্রস্তুত ছিলেন না এই খবরের জন্য। তারার দেশে পাড়ি দিলেন বলিউডের বিশিষ্ট অভিনেতা নানা পাটেকর। চারিদিকে শোকের ছায়া। মৃত্যুর আগে সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, শুটিং চলাকালে এক বিপজ্জনক দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন তিনি। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়ে ওঠে যে, তাঁকে বাঁচিয়ে তুলতে একটানা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর (CPR) দিতে হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত, দীর্ঘ এই প্রচেষ্টার ফলেই তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। এই ঘটনা সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সিপিআর নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সিপিআর আসলে কী, কখন এটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং কতক্ষণ পর্যন্ত এটি চালিয়ে যাওয়া উচিত? হার্ট অ্যাটাক হলে কি CPR থেরাপি কাজ দেয়? কী ভাবে দেবেন? সব জেনে নিন…..
সিপিআর (CPR) কী এবং কী ভাবে কাজ করে?
সিপিআর হল এমন একটি জরুরি আপৎকালীন প্রাথমিক চিকিৎসা কৌশল। কোনও ব্যক্তির শ্বাসপ্রশ্বাস বা হৃৎস্পন্দন আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে দেওয়া হয় CPR। এর মূল উদ্দেশ্য হাতের তালুর মাধ্যমে রোগীর বুকের ওপর নির্দিষ্ট ছন্দে ও চাপে কৃত্রিম পাম্পিং তৈরি করে মস্তিষ্ক এবং শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে সাময়িকভাবে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ সচল রাখা। এর ফলে আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা বা অ্যাম্বুল্যান্স এসে পৌঁছনোর আগেই রোগীর মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত বা অকেজো হয়ে পড়া রোধ করা যায়।
কখন সিপিআর প্রয়োগ করা প্রয়োজন?
কোনও ব্যক্তি হঠাৎ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে প্রথমেই সতর্ক হতে হবে। এই লক্ষণগুলো দেখলে দ্রুত সিপিআর শুরু করা উচিত:
১. কেউ যদি পুরোপুরি অচেতন বা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন এবং ডাকার পরও কোনও সাড়া না দেন।
২. শ্বাসপ্রশ্বাস যদি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় অথবা অস্বাভাবিকভাবে হাঁসফাঁস (Gasping) করতে থাকেন।
৩. গলার পাশের ধমনি (Carotid Pulse) বা কবজিতে নাড়ির স্পন্দন অনুভূত না হলে।
বিশেষত হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, জলে ডুবে যাওয়া, বিষাক্ত গ্যাস বা ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হওয়া, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কিংবা তীব্র ইলেকট্রিক শকের ক্ষেত্রে সেই মুহূর্তে সিপিআর কার্যকর প্রাণদায়ী হয়ে ওঠে।
কতক্ষণ সিপিআর চালানো উচিত?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধারণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, হাসপাতাল বা চিকিৎসকের বাইরে সাধারণ ক্ষেত্রে যতক্ষণ না পর্যন্ত জরুরি অ্যাম্বুল্যান্স বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী আসছেন, ততক্ষণ সিপিআর বন্ধ করা উচিত নয়।
তবে নানা পাটেকরের ক্ষেত্রে একটানা ৪৫ মিনিট সিপিআর চালানোর ঘটনা বিরল হলেও চিকিৎসাক্ষেত্রে অসম্ভব নয়। চিকিৎসকদের মতে :-
স্বাভাবিক ক্ষেত্রে :- রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার পর প্রথম ৩ থেকে ৪ মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে শুরু করে। তাই দ্রুত সিপিআর শুরু করা জরুরি।
কতক্ষণ চালাবেন :- যদি আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস ও স্পন্দন ফিরে আসে, তবে সিপিআর থামানো যেতে পারে। অন্যথায় আধুনিক ডিফিব্রিলেটর (AED) বা জরুরি চিকিৎসা সাহায্য না আসা পর্যন্ত এটি চালু রাখা প্রয়োজন।
দীর্ঘায়িত সিপিআর (Prolonged CPR) :- শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া (হাইপোথার্মিয়া), কোনও বিষক্রিয়া বা অল্পবয়সিদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট বা তার বেশি সময় ধরে সিপিআর চালিয়েও রোগীকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য করণীয়
জরুরি পরিস্থিতিতে কৃত্রিম মুখ-থেকে-মুখে শ্বাস দেওয়া নিয়ে সংশয় থাকলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী শুধু ‘হ্যান্ডস-অনলি সিপিআর’ (Hands-only CPR) দেওয়া উচিত। অর্থাৎ রোগীর বুকের মাঝখানে দুই হাতের তালু রেখে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার দ্রুত ও শক্তভাবে চাপ দেওয়া।
সঠিক সময়ে ও সঠিক নিয়মে সিপিআর দেওয়া গেলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। নানা পাটেকরের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে – আপৎকালীন মুহূর্তে ধৈর্য ও সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা কী ভাবে একজন মানুষের নিশ্চিত মৃত্যু ঠেকাতে পারে।