রেনকোজিতে শৈশবের স্বপ্ন পূরণ
রত্নজ্যোতি দত্ত, টোকিও, ০৮ অক্টোবর :- নেতাজির মূর্তিটার সামনে বসে হঠাৎ মনে হল, এত দিনের পথটা বুঝি এইখানেই এসে শেষ হল। চারপাশে মন্দিরের নিস্তব্ধতা। টোকিয়োর ব্যস্ত শহর যেন অনেক দূরে। সামনে সুভাষচন্দ্র বসু। আর তাঁর সামনে বসে থাকা আমি – গুয়াহাটির রেলওয়ে কলোনির সেই ছোট্ট স্কুলের ছেলেটি। বুধবার, ৭ অক্টোবর রেনকোজি মন্দিরে প্রায় দু’ঘণ্টা কাটালাম। কোনও তাড়া ছিল না। শুধু বসে থাকা, দেখা এবং মনে মনে ফিরে যাওয়া সেই অনেক দূরের শৈশবে। আমার প্রাথমিক স্কুলের নাম ছিল ‘নেতাজি শিশু বিদ্যাপীঠ’। গুয়াহাটির রেলওয়ে কলোনির ভিতরে সেই স্কুলেই প্রথম নেতাজির নাম শুনেছিলাম। তখন ইতিহাসের জটিলতা বোঝার বয়স হয়নি। জানতাম শুধু – এক জন মানুষ ছিলেন, যিনি সাহস করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, যাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজ, যাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার আহ্বান।শিক্ষকদের মুখে তাঁর গল্প শুনতে শুনতেই, অন্য বহু বাঙালি ছেলের মতো, নেতাজির প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। সেই আকর্ষণ বয়সের সঙ্গে মুছে যায়নি। বরং সময় যত এগিয়েছে, ততই যেন তার অর্থ বদলেছে, গভীর হয়েছে।সাংবাদিকতায় আসার পরে স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে পড়েছি। নেতাজিকে নিয়ে লিখেছি। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আজাদ হিন্দ ফৌজ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্বে তাঁর ভূমিকা – সব কিছু নতুন করে দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু বইয়ের পাতা আর সংবাদপত্রের প্রতিবেদন যতই পড়ি, কোথাও যেন একটা ব্যক্তিগত অসম্পূর্ণতা থেকে গিয়েছিল। রেনকোজিতে আসা সেই অসম্পূর্ণতারই যেন উত্তর। এই মন্দিরে সংরক্ষিত চিতাভস্মকে প্রচলিত ভাবে ১৯৪৫ সালের অগস্টে তাইওয়ানে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির কথিত মৃত্যুর পর সংগৃহীত তাঁর দেহাবশেষ বলে মনে করা হয়। তাঁর মৃত্যু কী ভাবে হয়েছিল, সেই বিমান দুর্ঘটনা ঘিরে কী ঘটেছিল, রেনকোজিতে রাখা দেহাবশেষ সত্যিই তাঁর কি না – এই প্রশ্নগুলি নিয়ে দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। অনুসন্ধানও হয়েছে বহু বার।কিন্তু সেই বিতর্কের কোনও নিষ্পত্তি করতে রেনকোজিতে আসিনি।



এসেছি এক জন ভারতীয় হিসাবে শ্রদ্ধা জানাতে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, এসেছি সেই মানুষটির স্মৃতির সামনে দাঁড়াতে, যাঁর নামের সঙ্গে আমার নিজের শৈশবের প্রথম পরিচয়। হয়তো এই কারণেই রেনকোজির অভিজ্ঞতাটি আমার কাছে অন্য রকম। এক জন সাংবাদিক হিসাবে ইতিহাসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক পেশাগত। কিন্তু কিছু ইতিহাস শুধু খবর নয়। কিছু ইতিহাস ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। নেতাজি আমার কাছে তেমনই একটি নাম।তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় সেনা – আইএনএ – ভারতের স্বাধীনতার লড়াইকে যে নতুন মাত্রা দিয়েছিল, তা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, সামরিক উদ্যোগ এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।রেনকোজিতে দাঁড়িয়ে তাই তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। শুধু নেতাজিকে নয়, জাপানকেও।কারণ, কয়েক দশক ধরে এই মন্দির তাঁর সঙ্গে যুক্ত স্মৃতিকে আগলে রেখেছে। মন্দিরের দর্শনার্থীদের খাতায় তাই লিখে রাখলাম আমার কৃতজ্ঞতার কথাও।নেতাজির ইতিহাসের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক গভীর এবং জটিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্বে, বিশেষত আজাদ হিন্দ ফৌজকে সংগঠিত ও পরিচালনার সময়, জাপানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। যুদ্ধের সেই অস্থির ইতিহাসের বহু স্মৃতি আজ মুছে গিয়েছে। রেনকোজি তার মধ্যে একটি নীরব স্মারক হয়ে রয়েছে। মন্দিরের একটি স্মারকফলকে চোখে পড়ল অটলবিহারী বাজপেয়ীর নামও। জাপান সফরের সময়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর অবদানের কথাও স্মরণ করেছিলেন। মন্দিরের ভিতরে দাঁড়িয়ে মনে হল, ইতিহাস কখনও শুধু বড় বড় ঘটনা দিয়ে তৈরি হয় না। কখনও একটি নাম, একটি মূর্তি, একটি স্মারকফলক, একটি মন্দির – কোনও এক সময়ের দরজা খুলে দেয়।রেনকোজিও তেমনই একটি দরজা। নেতাজির অন্তর্ধান, তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং রেনকোজিতে সংরক্ষিত দেহাবশেষের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। ইতিহাসের কিছু প্রশ্নের শেষ উত্তর হয়তো কখনও পাওয়া যায় না। কিন্তু তার বাইরেও একটি সত্য অটুট – ভারতের জাতীয় স্মৃতিতে সুভাষচন্দ্র বসুর জায়গা গভীর। এবং সেই জায়গাটি সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি। আমার জন্য অবশ্য রেনকোজির অর্থ আরও ব্যক্তিগত।গুয়াহাটির রেলওয়ে কলোনির সেই স্কুল। ‘নেতাজি শিশু বিদ্যাপীঠ’। একটি নাম। কয়েকটি গল্প। এক কিশোরের মনে তৈরি হওয়া বিস্ময়।সেই বিস্ময়ই এত বছর পরে আমাকে টোকিয়োর এই মন্দিরে এনে বসিয়েছে। নেতাজির মূর্তির সামনে বসে তাই মনে হচ্ছিল – সময় আসলে বৃত্তের মতো। শৈশবের যে জায়গা থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল, বহু দশক পরে এসে সেই স্মৃতির কাছেই যেন ফিরে এলাম। শৈশবের একটি স্বপ্ন ছিল রেনকোজিতে আসব। জাপান সফরে, অবশেষে, সেই স্বপ্ন পূরণ হল।
