বেশি পড়াশোনা করেও কখনও চাকরি পেতে বেশি সময় লাগে কেন?
সংবাদ সংস্থা, ১০ অক্টোবর :- বেশি পড়াশোনা করলে সহজে চাকরি পাওয়ার কথা। অথচ বহু স্নাতককেই চাকরির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের উপযোগিতা এবং কলেজে পড়ানো বিষয়ের সঙ্গে নিয়োগকারীদের চাহিদার ব্যবধান কোথায়, লিখছেন সন্তোষ নায়ার।
এক তরুণী স্নাতক হওয়ার পর আরও একটি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর আশা, এতে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কিন্তু দু’বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি উপযুক্ত চাকরির সন্ধানে রয়েছেন। অন্যদিকে, তাঁর এক আত্মীয় স্কুলের পড়াশোনাও শেষ করেননি। অথচ তিনি ইতিমধ্যেই কাজে যোগ দিয়েছেন। আয় হয়তো সামান্য, কিন্তু নিয়মিত।
নিশ্চয়ই বেশি পড়াশোনা করলে চাকরি পাওয়ার পথ আরও সহজ হওয়ার কথা, কঠিন নয়। কিন্তু পরিসংখ্যান এমন কিছু অস্বস্তিকর তথ্য সামনে আনছে, যা এই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (IHD) যৌথভাবে তৈরি ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৯.১ শতাংশ। অথচ যাঁরা পড়তে বা লিখতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে এই হার মাত্র ৩.৪ শতাংশ। মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৮.৪ শতাংশ। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বেকার তরুণ ভারতীয়দের মধ্যে শিক্ষিতদের অনুপাত ২০০০ সালে ৫৪.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৬৫.৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
শিক্ষিতরা কি পছন্দসই চাকরির জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ বেশি পান?
যিনি পড়তে বা লিখতে পারেন না এবং যাঁর হাতে সঞ্চিত অর্থও নেই, তাঁর পক্ষে দীর্ঘদিন বেকার থাকা সাধারণত সম্ভব নয়। বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁকে যে কোনও কাজ গ্রহণ করতে হয়। সেই কাজ প্রায়শই অসংগঠিত ক্ষেত্রে, কম বেতনের এবং অনিশ্চিত প্রকৃতির হয়।
তাঁদের মধ্যে বেকারত্বের হার কম হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁরা ভালো আছেন। বরং এর অর্থ, তাঁদের হাতে অপেক্ষা করার সুযোগই নেই।
অন্যদিকে, স্নাতক ডিগ্রিধারী কোনও তরুণ বা তরুণীর হাতে অপেক্ষা করার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। কখনও পরিবার তাঁদের আর্থিকভাবে সাহায্য করে, কখনও তাঁরা বছরের পর বছর পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্দিষ্ট ধরনের চাকরির সন্ধান করেন। তাঁদের প্রত্যাশা থাকে স্থায়ী বেতন, পরিচিত কোনও পদমর্যাদা এবং ভবিষ্যতে উন্নতির সুযোগ।
এই অপেক্ষাই পরিসংখ্যানে বেকারত্ব হিসেবে ধরা পড়ে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা কোনও কাজই করতে চান না বা তাঁদের কাজের কোনও সুযোগ নেই। বরং তাঁরা আরও ভালো কোনও সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।
অতএব, এর একটি কারণ খুবই সহজ। বেকারত্বের পরিসংখ্যানে তাঁদেরও ধরা হয়, যাঁরা উপযুক্ত চাকরির সন্ধান করছেন। আর শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম যে কোনও কাজ গ্রহণ করার পরিবর্তে অপেক্ষা করে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি।
কিন্তু এটাই পুরো ব্যাখ্যা নয়। এর পিছনে আরও একটি উদ্বেগজনক কারণ রয়েছে।
ডিগ্রি থাকলেই কি চাকরির জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠা যায়?
এক লক্ষেরও বেশি চাকরিপ্রার্থীর পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি বার্ষিক মূল্যায়ন ইন্ডিয়া স্কিলস রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের মাত্র ৫৬.৩৫ শতাংশ স্নাতককে কর্মসংস্থানের উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিয়োগকারী সংস্থাগুলির বাস্তবে যে ধরনের কাজের জন্য কর্মী প্রয়োজন, সেই কাজ করার মতো প্রস্তুতি তাঁদের রয়েছে।
এই হার গত কয়েক বছরে বেড়েছে। চার বছর আগে, অর্থাৎ ২০২২ সালে, তা ছিল ৪৬.২ শতাংশ। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু এর অর্থ এটাও যে, এখনও ভারতের প্রায় অর্ধেক স্নাতককে নিয়োগকারীরা সম্পূর্ণভাবে চাকরির উপযুক্ত বলে মনে করেন না, যদিও তাঁদের হাতে আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি রয়েছে।
এই তথ্য কলেজে পড়ানো বিষয়বস্তু এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে প্রকৃত ব্যবধানের দিকেই ইঙ্গিত করে।
একটি ডিগ্রি প্রমাণ করে যে, কেউ নির্দিষ্ট কয়েক বছর ধরে কোনও একটি বিষয় পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু সেই ডিগ্রি থাকলেই যে তিনি স্পষ্টভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন, অপরিচিত সমস্যার সমাধান করতে পারবেন কিংবা পড়াশোনায় অর্জিত জ্ঞান বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে প্রথম দিন থেকেই প্রয়োগ করতে পারবেন, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
শিক্ষিত বেকারত্বে মহিলাদের অনুপাত বেশি কেন?
এই সমস্যার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে – লিঙ্গবৈষম্য। শিক্ষিত বেকার তরুণ ভারতীয়দের মধ্যে মহিলাদের অনুপাত ৭৬.৭ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৬২.২ শতাংশ।
এর অর্থ এই নয় যে মহিলারা কাজ করতে চান না। বরং বিভিন্ন গবেষণায় বারবার দেখা গিয়েছে, মহিলারাও কাজ করতে আগ্রহী। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের কাছে উপযুক্ত চাকরির সুযোগ কম পৌঁছয়। পাশাপাশি, সামাজিক প্রত্যাশা এবং পারিবারিক দায়িত্বের বোঝা এখনও অসমভাবে মহিলাদের উপর বর্তায়।
উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোথায়, কী ধরনের এবং আদৌ বেতনের বিনিময়ে কাজ করতে পারবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই সামাজিক ও পারিবারিক বাধাগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তরুণদের কর্মজীবনের জন্য কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
এর কোনও অর্থই এই নয় যে শিক্ষার গুরুত্ব কমে গিয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষিত কর্মীরা সাধারণত আনুষ্ঠানিক শিক্ষাহীন কর্মীদের তুলনায় বেশি উপার্জন করেন। কিন্তু বাস্তব দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রস্তুতি ছাড়া শুধুমাত্র একটি ডিগ্রি ক্রমশ চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়ার পরিবর্তে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রাথমিক শর্ত হয়ে উঠছে।
যে তরুণ-তরুণীরা এখন পড়াশোনা করছেন, তাঁদের জন্য বাস্তব শিক্ষা হল – পড়াশোনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখা নয়, বরং ডিগ্রিকে কর্মসংস্থানের উপযোগী হয়ে ওঠার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।
আনুষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, বিভিন্ন পেশাভিত্তিক সার্টিফিকেশন এবং যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোর উপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র চূড়ান্ত বর্ষের মার্কশিটই চাকরির বাকি পথটুকু সহজ করে দেবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পরবর্তী সময়ে এমন কারও সঙ্গে দেখা হলে, যিনি বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও এখনও উপযুক্ত চাকরির সন্ধান করছেন, তখন তাঁকে নিয়ে সহজে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে একটু ভাবা দরকার।
বরং প্রশ্ন করা যেতে পারে, তাঁর অর্জিত জ্ঞান এবং বর্তমান সময়ে নিয়োগকারীদের প্রকৃত চাহিদার মধ্যে ঠিক কোন জায়গায় ব্যবধান রয়ে গিয়েছে?