আমেরিকায় ভারতীয়দের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত! TCS, Infosys, Cognizant সহ ৮ আইটি সংস্থা সাসপেন্ড, কী প্রভাব পড়বে ভারতীয়দের উপর?
সংবাদ সংস্থা, ১০ অক্টোবর :- টিসিএস (TCS), ইনফোসিস (Infosys), উইপ্রো (Wipro)-সহ মোট ৮টি তথ্য প্রযুক্তি (IT) সংস্থার স্থায়ী শ্রমিক সার্টিফিকেশন (Permanent Labor Certification) প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে মার্কিন শ্রম দফতর। এই প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় যাঁদের নিয়োগকারী সংস্থা এখনও নতুন পার্ম আবেদন জমা দেয়নি, তাঁদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে দেরি হতে পারে।
মার্কিন সরকারের একটা সিদ্ধান্ত, ভারতীয় তথ্য প্রযুক্তি সংস্থাগুলির জন্য বিরাট ধাক্কা। আমেরিকায় গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বড় পদক্ষেপ করল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিস, ইনফোসিস, কগনিজেন্ট, এইচসিএলটেক, ক্যাপজেমিনি, মাইক্রোসফ্ট, অ্যাডোবের মতো একাধিক তথ্য প্রযুক্তি সংস্থাকে সাসপেন্ড করল ট্রাম্প সরকার। আমেরিকার পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম থেকে এই সমস্ত সংস্থাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এই পার্ম (PERM)-ই অনাবাসীদের জন্য আমেরিকায় স্থায়ী ঠিকানার ভরসা গ্রিন কার্ড পেতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যারা এইচ-১বি ভিসা (H-1B visa)-এ রয়েছেন। ফলে এই সংস্থাগুলি সাসপেন্ড হয়ে যাওয়ায়, সংস্থাগুলিতে কর্মরত কর্মীরা, যারা আমেরিকায় রয়েছেন, তাদের গ্রিন কার্ড পেতে বাধা তৈরি হল।
কী সিদ্ধান্ত ট্রাম্প সরকারের?
টিসিএস (TCS), ইনফোসিস (Infosys), উইপ্রো (Wipro)-সহ মোট ৮টি তথ্য প্রযুক্তি (IT) সংস্থার স্থায়ী শ্রমিক সার্টিফিকেশন (Permanent Labor Certification) প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে মার্কিন শ্রম দফতর। এর ফলে ওই সংস্থাগুলির নতুন পার্ম (PERM) আবেদন গ্রহণ করা হবে না। একই সঙ্গে, আগে জমা পড়া আবেদনগুলির প্রক্রিয়াও আপাতত বন্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে আমেরিকায় কর্মরত বহু বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায়।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, বিদেশি কর্মী নিয়োগের কিছু কর্মসূচির অপব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে আমেরিকার নাগরিকরা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সেই কারণেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
কোন ৮টি আইটি সংস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ?
মার্কিন শ্রম দফতরের এই সিদ্ধান্তের অধীনে রয়েছে মোট ৮টি সংস্থা। এর মধ্যে ৩টি আমেরিকান এবং ৫টি ভারতীয় সংস্থা। আমেরিকান সংস্থাগুলি হল ক্যাপজেমিনি, মাইক্রোসফ্ট এবং অ্যাডোবে। অন্যদিকে, ভারতীয় সংস্থাগুলি হল কগনিজেন্ট, ইনফোসিস, টিসিএস, উইপ্রো এবং এইচসিএল।
কী বলছে টিসিএস?
মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পর নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারতের অন্যতম বৃহৎ আইটি পরিষেবা সংস্থা টিসিএস (TCS)। শুক্রবার বিএসই (BSE)-তে জমা দেওয়া বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, পার্ম প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ার কারণে তাদের কর্মী নিয়োগের কৌশল বা গ্রাহকদের পরিষেবায় কোনও প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করছে না।
টিসিএস জানিয়েছে, মার্কিন সরকারের ঘোষণার বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখেছে এবং শ্রম দফতরের নির্দেশ মেনেই চলবে। আমেরিকায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিভাদের উপরেই জোর দেয় সংস্থাটি। পাশাপাশি, বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে।
টিসিএস-এর দাবি, গত দু’বছরে তাদের পার্ম আবেদনের সংখ্যা এক ডিজিটের মধ্যেই ছিল। তাই এই কর্মসূচি স্থগিত হওয়ার কারণে তাদের কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা বা গ্রাহকদের পরিষেবায় প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করছে না। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, আমেরিকার ৩১টি অফিস ও ডেলিভারি সেন্টার জুড়ে তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থানীয় কর্মী রয়েছেন। আগামী পাঁচ বছরে আমেরিকায় আরও ১৫ হাজার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে টিসিএস-এর।
কেন গুরুত্বপূর্ণ পার্ম প্রক্রিয়া?
আমেরিকায় কর্মরত বিদেশি কর্মীদের জন্য পার্ম (PERM) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। অধিকাংশ চাকরিভিত্তিক গ্রিন কার্ডের ক্ষেত্রে এই শংসাপত্র প্রয়োজন হয়। এর মাধ্যমে নিয়োগকারী সংস্থাকে প্রমাণ করতে হয় যে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে আমেরিকার কর্মীদের বেতন বা চাকরির সুযোগের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
এই প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় যাঁদের নিয়োগকারী সংস্থা এখনও নতুন পার্ম আবেদন জমা দেয়নি, তাঁদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে দেরি হতে পারে। নতুন আবেদন জমা না পড়লে তাঁরা পার্ম-এর মাধ্যমে নতুন প্রায়োরিটি ডেট (Priority Date)-ও পাবেন না।
প্রায়োরিটি ডেট কী?
গ্রিন কার্ড পাওয়ার জন্য আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইনে কার অবস্থান কোথায়, তা নির্ধারণ করতে এই তারিখ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ভারতীয় পেশাদারদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশভিত্তিক সংখ্যার সীমা এবং বিপুল চাহিদার কারণে ভারতীয় আবেদনকারীদের গ্রিন কার্ড পেতে এমনিতেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তবে এই স্থগিতাদেশের অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমস্ত বিদেশি কর্মীর ভিসা বাতিল হয়ে গিয়েছে। মূলত পার্ম আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণের উপরেই এই পদক্ষেপের প্রভাব পড়ছে।
কী বলেছেন জেডি ভান্স?
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স (JD Vance) এই পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করার সময় এইচ-১বি (H-1B) ভিসায় কর্মরত বিদেশি কর্মীদের বিদেশি চুক্তিবদ্ধ দাস (foreign indentured servants) বলে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু সংস্থা বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থাকে এমনভাবে ব্যবহার করছে, যার ফলে আমেরিকান কর্মীরা চাকরির সুযোগ হারাচ্ছেন।
মাইক্রোসফ্টের উদাহরণ দিয়ে ভান্স দাবি করেন, ২০২৫ সালে সংস্থাটি প্রায় ৬ হাজার আমেরিকান কর্মীকে ছাঁটাই করেছিল। অথচ একই সময়ে সংস্থাটি এইচ-১বি ভিসায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ এবং গ্রিন কার্ডের জন্য পার্ম আবেদন করেছিল। তাঁর বক্তব্য, একই ধরনের পদে আমেরিকান কর্মীদের ছাঁটাই করে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের বিষয়টি উদ্বেগজনক।
এদিকে, আমেরিকার নয়টি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষকদের জন্য চালু জে-১ (J-1) ভিসা কর্মসূচি নিয়েও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে ইয়েল (Yale), হাভার্ড (Harvard), স্ট্যানফোর্ড (Stanford) এবং ক্যালটেক (Caltech)-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়। সব মিলিয়ে, মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে ভারতীয় আইটি কর্মীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা প্রভাবিত হবে, তা নির্ভর করবে স্থগিতাদেশ কত দিন বহাল থাকে এবং পরবর্তী সময়ে কী নির্দেশ দেওয়া হয়, তার উপর।