৩৭৫ বছরের প্রাচীন এ বাড়িতে ছিল বিদ্যাসাগরের হাওয়ামহল, শুটিং করেছিলেন সত্যজিৎ! দুর্গাপুজোর পরতে – পরতে সংস্কৃতি
সংবাদ সংস্থা, ০৯ অক্টোবর :- এ বাড়িতে তিনি এসেছিলেন শুধু নয়, অনেক সময় কাটিয়েও গিয়েছেন। তিনি বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রাণপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই বাগানবাটিতেই ছবির শুটিং করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এই দুই ব্যক্তিত্ব ছাড়াও এ-বাড়িতে এসেছেন আরও অনেক বিখ্যাত মানুষ। গত কয়েক শতকের ইতিহাসে এ বাড়ির নাম রয়েছে। পূর্ব বর্ধমানের চকদিঘির জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোয় স্মৃতি-ইতিহাসের এই পরত আজও বাংলার অন্যতম চর্চার বিষয়।
বিদ্যাসাগরের ‘হাওয়ামহল’ :-
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বকালে এই বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থার পত্তন হয়। সেই সমসাময়িক কালের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জামালপুরের চকদিঘির জমিদারদের নামও। দেশ স্বাধীন হবার পরে, জমিদারি প্রথা বিলীন হয়ে গেলেও প্রায় ৩৭৫ বছর ধরে চকদিঘির বাগানবাটি সেই জমিদারি ঐতিহ্যের স্বাক্ষরই বহন করে চলেছে। একশো বিঘা জমি জুড়ে রয়েছে জমিদারদের বাগানবাড়ি। ঐতিহ্য ও পরম্পরা মেনে এই বাগানবাটির সুবিশাল মন্দিরে প্রায় ২৮৭ বছর ধরে পূজিত হয়ে আসছেন দেবী দুর্গা। জমিদারদের বাগানবড়ির জন্য চকদিঘির নামডাক। বাগানবাটি জুড়ে আছে বড় বড় অট্টালিকা, কাছারিবাড়ি, অন্দর বাড়ি, একাধিক দিঘি ও গোমস্তাখানা। জমিদার পরিবারের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই বাগানবাটিতেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের থাকার জন্য একটি জলাশয়ের ধারে তৈরি হয়েছিল হাওয়াখানা ঘর। যে ঘরটির পরিচিত ‘হাওয়ামহল’ নামেই। জমিদারি আমলে বাগানবাটিতে তৈরি হওয়া হাতিশাল ও ঘোড়াশালের অস্তিত্ব বহুদিনই বিলীন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বকালে এই বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থার পত্তন হয়। সেই সমসাময়িক কালের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জামালপুরের চকদিঘির জমিদারদের নামও। দেশ স্বাধীন হবার পরে, জমিদারি প্রথা বিলীন হয়ে গেলেও প্রায় ৩৭৫ বছর ধরে চকদিঘির বাগানবাটি সেই জমিদারি ঐতিহ্যের স্বাক্ষরই বহন করে চলেছে।
সত্যজিতের ‘ঘরে বাইরে’ :-
শুধু পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নয়, এ বাড়ির সঙ্গে জড়িত সত্যজিৎ রায়ের নামও। সত্যজিৎ তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ সিনেমার শুটিংয়ের জন্য বেছে নিয়েছিলেন অপূর্ব সুন্দর এই বাগানবাড়িটিকেই। তাঁর পরেও এ বাড়িতে হয়েছে আরও অনেক ছবির শুটিং।
বুন্দেলখণ্ড থেকে বর্ধমান ;-
চকদিঘির জমিদারদের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন রাজপুত ক্ষত্রিয়। ইতিহাসপ্রসিদ্ধ বুন্দেলখণ্ডের শাসকদের বংশধররা এখানে জমিদারি চালাতেন। দুর্গাচরণ রায় লিখিত ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে চকদিঘির জমিদারদের কথা। তা থেকে জানা যায়, রাজস্থান থেকে চকদিঘিতে সর্বপ্রথম এসে ছাউনি ফেলেছিলেন নল সিং। সেখানেই তিনি বসবাস শুরু করেছিলেন। পরবর্তী কালে জমিদারি স্বত্ব লাভের পরে নল সিং অগাধ ঐশ্বর্য ও খ্যাতিলাভে সমর্থ হন। কথিত আছে, এই জমিদারি তিনি লাভ করেছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে । দামোদরের পূর্ব তীরের শুড়া মৌজাস্থিত হাজামজা জলাশয় ও দিঘিবিশিষ্ট নিস্কর জমিদারির স্থানটি পরবর্তীকালে পরিচিতি পায় চকদিঘি নামে।
জমিদার সারদাপ্রসাদ ;-
এই জমিদার বংশের খ্যাতি শীর্ষে পৌছে ছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের হাত ধরে। প্রজাবৎসল জমিদার সারদাপ্রসাদ তাঁর জমিদারি এলাকার প্রভূত উন্নতিসাধনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। শিক্ষা বিস্তারের জন্য চকদিঘিতে তৈরি করেছিলেন বিদ্যালয়। যে বিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এছাড়াও চকদিঘি হাসপাতাল এবং আজকের মেমারি-চকদিঘি সড়কপথ– সবই তৈরি হয়ছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের একান্ত উদ্যোগে। জমিদার হয়েও ভোগবিলাসকে তুচ্ছ করে তিনি জনসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়জিত করেছিলেন। প্রজারা একন্তভাবেই ছিলেন সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের গুণমুগ্ধ। জমিদার বংশের পরবর্তী প্রজন্ম ললিতমোহন সিংহরায়, লীলামোহন সিংহরায় প্রমুখ সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের পথ অনুসরণ করে জমিদারি চালিয়েছিলেন। বর্তমান বংশধররাও একই ভাবে পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছেন।
দুই মন্দিরে এক পুজো ;-
বাগানবাটির ভিতর কাছারিবাড়ির সামনেই রয়েছে দুর্গা পুজোর স্থায়ী মন্দির। মন্দিরের সঙ্গেই রয়েছে টিনের ছাউনি দেওয়া বিশালাকার জায়গা। জমিদার বাড়ির কেয়ারটেকার পীযূষ বিদ জানিয়েছেন, এই পরিবারের অন্য দুর্গামন্দিরটি রয়েছে চকদিঘি থেকে প্রায় তিন কিমি দূরে মণিরামবাটি গ্রামে। সেখানকার মন্দিরটিও একই আদলে তৈরি। সেখানেও জমিদারি ঐতিহ্য মেনে পুজোর যাবতীয় আয়োজন করা হয়। পঞ্জিকার সময়সারণি মেনে একই সময়ে দুই মন্দিরে হয় পুজো।
বৈদিকমতে :-
বৈদিক মতে হয় সিংহরায় জমিদার বড়ির দুর্গা পুজোর আরাধনা। একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজের প্রতিমা। দেবী মূর্তির দুপাশে বসানো থাকে জয়া ও বিজয়া নামে দুই সখীর মূর্তি। মন্দিরচত্বর সাজানো হয় ভিন্ন আঙ্গিকে। একটি গোটা নারকেল, আম্রপল্লব ও একটি কাঁঠালি কলা এক সঙ্গে নিয়ে বাঁধা থাকে মন্দির চত্বরের প্রতিটি থামে। প্রতিপদের দিন থেকে শুরু হয় পুজো। পঞ্জিকার নির্ঘন্ট মেনে পুজো করেন হুগলির লোকনাথ এলাকানিবাসী কূলপুরোহিত। পুজোয় অন্য ফল যাই থাক কাজু -কিসমিস, পেস্তা-আখরোট ও মেওয়া ফল চাই। নৈবেদ্য সাজানো হয় চিনির সন্দেশ, ছোট ও বড় মুণ্ডি, ডোনা, রশকরা, মুড়কি প্রভৃতি দিয়ে। পারিবারিক নিয়ম মেনে স্থলপদ্মে হয় দেবীর পুজো। একমাত্র সন্ধিপুজোয় লাগে ১০৮টি জলপদ্ম। সন্ধিপুজোর সময় দুটি মন্দিরের দেবী প্রতিমার সামনে ব্রাহ্মণ পরিবারের বিধবা মহিলাকে দিয়ে ধুনো পোড়ানো হয়। পুজোর প্রতিটি দিন দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় হরেক রকম নিরামিষ ভোগ। মহাষ্টমীর দিন থেকে পুজোর নৈবেদ্যে দেওয়া হয় মাখা সন্দেশ। পূর্বে ছাগ বলিদান প্রথা থাকলেও বেশ কয়েক বছর হল বলিদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে এখন সন্দেশ নিবেদন করা হয়। নবমীর দিন একই সময়ে চকদিঘি ও মণিরামবাটির মন্দিরে কুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হয়। জমিদার বাড়ির পুজোর জোগাড়ে মহিলাদের অংশগ্রহণ নেই। সবকিছুই করেন জমিদার বংশের পুরুষরা।
পর্দার আড়ালেই মেয়েরা ;-
সিংহরায় পরিবারের মহিলাদের এখনও পুজোয় পর্দার আড়ালেই থাকতে হয়। যা জানা গিয়েছে, অন্দরমহল থেকে পরিবারের মহিলারা মন্দিরে পুজো দিতে কিংবা ঠাকুর দেখতে আসার সময় তাদের পথের দু’পাশ আড়াল করার জন্য কাপড় দিয়ে ‘কানাত’ টাঙানো হয়। পারিবারিক প্রথা মেনে পুজোর সময় বাড়ির বউরা পর্দার পেছনে থাকেন। বংশ পরম্পরয়ায় এই ঐতিহ্য মেনে আসা হচ্ছে। আগে পুজোয় বাগানবাটিতে হত যাত্রাপালা। এখন সেসব রেওয়াজ উঠে গিয়েছে। প্রথা মেনে একাদশীতে কাঙ্গালি বিদায় পর্ব শেষে পুজোর সমাপ্তি ঘটে জমিদার বাড়িতে। পুজোর কটাদিন বাগান বাটির ভিতরে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার থাকে। তাই পুজোর দিনগুলিতে জমিদারি নিদর্শন পরিদর্শনে আসা মানুষজনের ভিড় উপচে পড়ে চকদিঘির এই বাগানবাটিতে।