ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : স্মরণ ও মনন/ আশুতোষ দাস
২০৬তম জন্মজয়ন্তীতে ব্যাপক সাড়া
“বঙ্গসাহিত্যের রাত্রি স্তব্ধ ছিল তন্দ্রার আবেশে
অখ্যাত জড়ত্বভারে অভিভূত। কী পুণ্য নিমিষে
তব শুভ অভ্যুদয়ে বিকীরিল প্রদীপ্ত প্রতিভা,
প্রথম আশার রশ্মি নিয়ে এল প্রত্যুষের বিভা…”
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর—এই নামটি উচ্চারণ করলেই একই সঙ্গে কয়েকটি পরিচয় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়—পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, লেখক, বাংলা গদ্যের নির্মাতা, সমাজসংস্কারক, নারীশিক্ষার প্রবক্তা, বিধবাবিবাহ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরুষ এবং সর্বোপরি এক অসাধারণ মানবতাবাদী।১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। অতি সাধারণ আর্থিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে উঠে এসে অধ্যবসায়, মেধা ও আত্মশক্তির বলে তিনি উনিশ শতকের বাংলার অন্যতম প্রধান মনীষীতে পরিণত হন। ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
২০২৬ সালে তাঁর জন্মের ২০৬ বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু বিদ্যাসাগরের গুরুত্ব কেবল জন্মতারিখের স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর জীবন ও কর্মকে নতুন সময়ের আলোয় বিচার করাই প্রকৃত স্মরণ।
বিদ্যাসাগরের শৈশব ছিল সংগ্রামের। পাঁচ বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষার সূচনা। পরে কলকাতায় এসে সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৮২৯ সালের জুন মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন এবং অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ১৮৩৯ সালের মধ্যেই তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত হন।
এই উপাধি তাঁর কাছে শুধু সম্মানের পরিচয় ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল তাঁর আজীবন সাধনার প্রতীক।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন—জন্মের সামাজিক বা আর্থিক অবস্থান মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; শিক্ষা, অধ্যবসায় ও নৈতিক চরিত্র মানুষকে নিজের ইতিহাস নির্মাণের ক্ষমতা দেয়।
১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা শেষ করার পর তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে বাংলা ভাষার প্রধান পণ্ডিত হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর প্রশাসনিক ও শিক্ষাচিন্তার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—শিক্ষাকে কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির অধিকার হিসেবে না দেখে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
১৮৫৫ সালে তিনি সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব পান। নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর অঞ্চলে স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বহু বিদ্যালয় স্থাপনে ভূমিকা রাখেন। শিক্ষক-প্রশিক্ষণের জন্য নর্মাল স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তাঁর শিক্ষাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের কাছে শিক্ষা ছিল কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করার বিষয় নয়; শিক্ষা ছিল সামাজিক পরিবর্তনের শক্তি।
উনিশ শতকের বাংলায় নারীশিক্ষা নিয়ে প্রবল সামাজিক আপত্তি ছিল। এমন এক সময়ে বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।
সরকার যখন বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়, বিদ্যাসাগর সেই কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৮৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে তিনি একাধিক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে বেথুন সোসাইটির সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন, যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল নারীশিক্ষার প্রসার।
কারণ নারীকে শিক্ষার অধিকার দেওয়া মানে শুধু একজন নারীকে শিক্ষিত করা নয়; একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং ক্রমে একটি সমাজের চিন্তাধারাকে পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
আজ নারীশিক্ষা আমাদের কাছে স্বাভাবিক অধিকার বলে মনে হলেও উনিশ শতকে এর পক্ষে দাঁড়ানো ছিল এক সাহসী সামাজিক অবস্থান।
বিদ্যাসাগরের শিক্ষাচিন্তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ‘বর্ণপরিচয়’।
১৮৫১ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থ দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষার প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম প্রধান পাঠ্য হয়ে ছিল। এর পাশাপাশি বোধোদয়, কথামালা, চরিতাবলী, জীবনচরিত প্রভৃতি গ্রন্থও তিনি রচনা করেন।
‘বর্ণপরিচয়’-এর সাফল্যের কারণ কেবল এর বিষয়বস্তু নয়; ভাষাকে সহজ, সুস্পষ্ট ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার মধ্যেও এর বিশেষত্ব নিহিত।
বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করেছিলেন—শিক্ষার দরজা খুলতে হলে ভাষাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
তাই তাঁর ভাষাচিন্তা ছিল শিক্ষাচিন্তারই একটি অংশ।
বাংলা গদ্যের নির্মাণে এবং
বাংলা গদ্যের ইতিহাসে বিদ্যাসাগরের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তাঁর গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা, যুক্তি, সংযম ও সৌন্দর্য।
বেতাল পঞ্চবিংশতি, শকুন্তলা, সীতার বনবাস, ভ্রান্তিবিলাস প্রভৃতি রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা গদ্যকে একটি সুসংবদ্ধ রূপ দিতে সাহায্য করেন।
তাঁর গদ্যে সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারের ব্যবহার থাকলেও বাক্যগঠন ছিল সুস্পষ্ট ও সংগঠিত। ফলে বাংলা গদ্য ক্রমশ আধুনিক পাঠযোগ্যতার দিকে অগ্রসর হয়।
বাংলা ভাষার ইতিহাসে তাঁর এই ভূমিকা কেবল সাহিত্যিক নয়; শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সুসংগঠিত ভাষাই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে জ্ঞান বিস্তারের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো বিধবাবিবাহ আন্দোলন।
তৎকালীন সমাজে বহু বিধবা নারী কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হতেন। বিদ্যাসাগর এই পরিস্থিতিকে মানবিক ও সামাজিক প্রশ্ন হিসেবে দেখেছিলেন।
তিনি শুধু আবেগের ভাষায় প্রতিবাদ করেননি। শাস্ত্রের ব্যাখ্যা, যুক্তি ও ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিধবাবিবাহের পক্ষে মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
১৮৫৫ সালে বিধবা বিবাহের পক্ষে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান এবং সামাজিক সমর্থন সংগঠিত করেন। প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও আন্দোলন এগিয়ে যায়। অবশেষে ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে বিধবা বিবাহ আইন প্রণীত হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে তাঁর উদ্যোগে একটি বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।
এখানে বিদ্যাসাগরের পদ্ধতিটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়—
তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আবেগকে যুক্তির সঙ্গে, আর যুক্তিকে কর্মের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধু অন্যকে উপদেশ দিয়ে থেমে থাকেননি।
বিধবা বিবাহের পক্ষে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি সামাজিক বিরোধিতা, নিন্দা ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এমনকি নিজের একমাত্র পুত্রের সঙ্গে বিধবার বিবাহ দিতেও তিনি দ্বিধা করেননি।
অর্থাৎ তাঁর সমাজসংস্কার ছিল কেবল বক্তৃতার বিষয় নয়; তাঁর ব্যক্তিজীবনেরও অংশ।
এই কারণেই তাঁর সংস্কারচিন্তার নৈতিক শক্তি এত গভীর।
বিধবা বিবাহ আন্দোলনের পরেও বিদ্যাসাগরের সামাজিক চিন্তা থেমে থাকেনি। তিনি কুলীন সমাজে বহুবিবাহ এবং বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং এগুলোর প্রতিরোধে সরকারের কাছে আবেদন জানান।
তাঁর সমাজসংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের প্রচলিত কাঠামোকে অকারণে ধ্বংস করা নয়; বরং যে প্রথা মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও কল্যাণের পরিপন্থী, তাকে যুক্তির আলোয় বিচার করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে তাঁর সময়ের অনেকের থেকে আলাদা করে।
‘দয়ার সাগর’ নামে বিদ্যাসাগরের যে পরিচয় বাঙালির স্মৃতিতে অম্লান, তার পেছনে ছিল বাস্তব মানবসেবা।
তাঁর মানবিকতা ছিল সক্রিয়। অর্থাৎ কেবল দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ নয়—প্রয়োজনে নিজের সামর্থ্য ব্যবহার করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
এই মানবিকতার একটি স্মরণীয় ঘটনা মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদেশে আর্থিক সংকটে পড়ে মাইকেল বিদ্যাসাগরের সাহায্য চান। ঐতিহাসিক জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ আছে, বিদ্যাসাগর ঋণ করে অর্থ পাঠিয়েও তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।
কারণ বিদ্যাসাগরের মানবিকতা ছিল ব্যক্তি, মত বা পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ।
বিদ্যাসাগর ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের সম্পর্ক বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি আকর্ষণীয় অধ্যায়।
মাইকেল ছিলেন প্রতিভাবান কিন্তু জীবনের নানা পর্যায়ে আর্থিক ও ব্যক্তিগত সংকটে জর্জরিত। বিদ্যাসাগর তাঁর দুর্দিনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ইউরোপে মাইকেলের সংকটকালে বিদ্যাসাগর একাধিকবার অর্থসাহায্য করেন।
পরবর্তীকালে মাইকেল তাঁর কৃতজ্ঞতা কবিতায় প্রকাশ করেন। সেই কবিতাই আজ বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
এখানে সাহিত্য ও জীবনের একটি অসাধারণ যোগসূত্র তৈরি হয়েছে—
যে মানুষটি মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর মানবিকতার সাক্ষ্য বহন করেছে বাংলা কবিতাও।
বিদ্যাসাগরের কর্মজীবনের মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরকে শুধু পণ্ডিত হিসেবে দেখেননি; তাঁকে দেখেছেন বাংলা সমাজ ও সাহিত্যের নবজাগরণের অন্যতম আলোকবর্তিকা হিসেবে।
তিনি লিখেছেন—
“হে বিদ্যাসাগর, পূর্ব দিগন্তের বনে-উপবনে
নব উদ্বোধনগাথা উচ্ছ্বসিল বিস্মিত গগনে।”
এই দুটি পংক্তির মধ্যেই বিদ্যাসাগরের ঐতিহাসিক ভূমিকার একটি গভীর মূল্যায়ন নিহিত।
‘পূর্ব দিগন্ত’ এখানে যেন নতুন ভোরের প্রতীক। আর ‘নব উদ্বোধনগাথা’ নির্দেশ করে চিন্তা, শিক্ষা, ভাষা ও সমাজসংস্কারের নতুন যুগকে।
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণকে কেবল পাশ্চাত্য শিক্ষার আগমন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এই নবজাগরণের ভিতরে ছিল একদিকে যুক্তিবাদ, অন্যদিকে মানবিকতা; একদিকে আধুনিক শিক্ষা, অন্যদিকে সমাজসংস্কারের প্রয়াস।
বিদ্যাসাগরের জীবন এই দুই ধারাকে একত্র করেছিল।
তিনি সংস্কৃত শাস্ত্রে গভীরভাবে শিক্ষিত ছিলেন, কিন্তু সেই শিক্ষাকে অন্ধ রক্ষণশীলতার পক্ষে ব্যবহার করেননি। বরং প্রাচীন জ্ঞানকে বিচারবুদ্ধির আলোয় পাঠ করে তিনি সামাজিক সংস্কারের যুক্তি নির্মাণ করেছিলেন।
এইখানেই তাঁর আধুনিকতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য।
বিদ্যাসাগরের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ।
নারীশিক্ষার প্রশ্নে—মানুষের শিক্ষার অধিকার।
বিধবাবিবাহের প্রশ্নে—মানুষের সামাজিক মর্যাদা।
শিশুশিক্ষার প্রশ্নে—মানুষের জ্ঞানার্জনের অধিকার।
দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে—মানুষের দুঃখের প্রতি দায়বদ্ধতা।
বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে—মানুষের কাছে জ্ঞানকে সহজ করে পৌঁছে দেওয়া।
এই সবকিছুকে একসূত্রে বাঁধলে যে শব্দটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—
আজ আমরা প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও তথ্যের অভূতপূর্ব যুগে বাস করছি। কিন্তু মানুষের সামাজিক সমস্যা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি।
শিক্ষার বৈষম্য, নারী-পুরুষের অসমতা, কুসংস্কার, অন্ধ অনুকরণ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা—বিভিন্ন রূপে এখনও আমাদের সামনে উপস্থিত।
তাই বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতের একটি মহান ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা করা নয়।
তাঁর জীবন আজও আমাদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন রাখে—
শিক্ষা কি কেবল চাকরির জন্য?
জ্ঞান কি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য?
সমাজে অন্যায় দেখলে আমরা কি প্রশ্ন করি?
নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে আমরা কতটা বাস্তব জীবনে সম্মান করি?
দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক শক্তি কি আমাদের আছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই বিদ্যাসাগরকে নতুন করে আবিষ্কার করা সম্ভব।
১৫. স্মরণ নয়, অনুসরণ
বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা শ্রদ্ধার একটি বাহ্যিক প্রকাশ। কিন্তু তাঁর প্রকৃত স্মরণ তখনই হবে, যখন তাঁর জীবন থেকে আমরা কিছু গ্রহণ করব।
তাঁর কাছ থেকে নিতে হবে—
শিক্ষার প্রতি গভীর নিষ্ঠা,
যুক্তিবোধ,
নারীশিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা,
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সাহস,
দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা,
ভাষাকে সহজ ও মানুষের উপযোগী করার দৃষ্টিভঙ্গি,
এবং সর্বোপরি মানবিকতা।
বিদ্যাসাগর আমাদের শেখান—একজন মানুষ একা হলেও সমাজের প্রচলিত অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন।
তাঁর শক্তি ছিল পদে নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায়।
উপসংহার : বিদ্যাসাগরকে নতুন করে পাঠ
১৮২০ সালের বীরসিংহের সেই দরিদ্র পরিবারের সন্তান থেকে ১৮৯১ সালের মহাপ্রয়াণ পর্যন্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন যেন এক দীর্ঘ আলোকযাত্রা।
এই যাত্রায় ছিল দারিদ্র্য, অধ্যবসায়, জ্ঞান, কর্ম, বিরোধিতা, সমাজসংস্কার, শিক্ষা, সাহিত্য এবং অসংখ্য মানুষের প্রতি মমতা।
তাই বিদ্যাসাগরকে শুধু ‘পণ্ডিত’ বললে তাঁর পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শুধু ‘সমাজসংস্কারক’ বললেও তাঁকে সম্পূর্ণ ধরা যায় না। তিনি ছিলেন জ্ঞান ও মানবিকতার এক বিরল সমন্বয়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দেখেছিলেন নবজাগরণের আলোকবর্তিকা হিসেবে। আর তাঁর প্রিয় বন্ধু মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁকে অভিহিত করেছিলেন বিদ্যার সাগর ও করুণার সিন্ধু হিসেবে।
আজ তাঁর ২০৬তম জন্মজয়ন্তীতে তাই আমাদের শ্রদ্ধার সবচেয়ে বড় ভাষা হোক—
শিক্ষায় মানবিকতা,
চিন্তায় যুক্তি,
কর্মে সাহস,
আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা।
শেষ করি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সেই অমর শ্রদ্ধাঞ্জলির কয়েকটি পংক্তি দিয়ে—
“বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু!”
— মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
এই কয়েকটি পংক্তিই যেন বিদ্যাসাগরের সমগ্র জীবনকর্মের এক সংক্ষিপ্ত মহাকাব্য—
বিদ্যার সঙ্গে করুণা, পাণ্ডিত্যের সঙ্গে মানবিকতা, আর জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের কল্যাণ।