পুজোয় যানজট, বিদ্যুৎ, জল ও নিরাপত্তায় বিশেষ নজর শিলচর পুরনিগমের, রাস্তার ধারে মন্ডপ নির্মাণে মিলবে না অনুমতি
জনসংযোগ, শিলচর :- দুর্গাপুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই উৎসবের প্রস্তুতিতে তৎপর হয়ে উঠেছে শিলচর পুরনিগম (এসএমসি)। পুজোর দিনগুলিতে শহরের যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানীয় জল সরবরাহ, রাস্তা মেরামতি, পরিচ্ছন্নতা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে পুর কর্তৃপক্ষ। এই উপলক্ষে মঙ্গলবার শিলচর পুরনিগমের সম্মেলনকক্ষে এক প্রস্তুতি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শিলচর পুরনিগমের কার্যনির্বাহী আধিকারিক অভিজিৎ বে (AUAS)। উপস্থিত ছিলেন উদারবন্দের বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা, কাছাড়ের সহকারী আয়ুক্ত মাসি টোপনো, (এসিএস) সাময়িক প্রসঙ্গের স্বত্বাধিকারী তথা সম্পাদক তৈমুর রাজা চৌধুরী, মৃদুল মজুমদার, এপিডিসিএলের ডিরেক্টর নিত্যভূষণ দে, বিশিষ্ট নাগরিক বাবুল হোড় ও দুলাল মিত্র সহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট বিভাগের আধিকারিক এবং উপস্থিত ছিলেন সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। বৈঠকের শুরুতে কার্যনির্বাহী আধিকারিক অভিজিৎ বে উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানান। শিলচর জুড়ে দুর্গাপুজোয় বিপুল সংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগমের কথা উল্লেখ করে তিনি উৎসবের প্রস্তুতিতে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পুজো কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, উৎসবের পরিবেশ যেন সুশৃঙ্খল থাকে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয় এবং সাধারণ মানুষকে কোনও অযথা অসুবিধার মুখে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।বৈঠকে মাইক ও লাউডস্পিকারের ব্যবহার, বিশেষ করে ডিজে সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা হয়। প্রতিমা বিসর্জনের দিন শোভাযাত্রায় ডিজে ব্যবহারের বিষয়েও উপস্থিত সদস্যেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন করতে পুজো কমিটিগুলিকে আহ্বান জানান কার্যনির্বাহী আধিকারিক। রাস্তার উপর মণ্ডপ নির্মাণের ফলে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় এবং নিত্যযাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ ধরনের সমস্যা এড়াতে রাস্তার ধারে মণ্ডপ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়।পুজোর আগে শহরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। নিকাশি নালা সময়মতো পরিষ্কার করা এবং রাস্তার পাশে জমে থাকা আবর্জনা সরানোর জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে শ্রমিক ও তদারকির দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের নিয়ে পৃথক দল গঠন করা হয়েছে। উৎসব শুরুর আগেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিকল পথবাতি মেরামত অথবা প্রয়োজনে পরিবর্তনের জন্য পুরনিগমের ইউটিলিটি শাখাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুজোমণ্ডপের আশপাশে যথাযথ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং জীবাণুনাশক ছড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুরনিগমের পরিদর্শককেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উৎসবের দিনগুলিতে পর্যাপ্ত পথবাতি এবং নিরবচ্ছিন্ন জল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান উপস্থিত বিধায়কগণ। রাস্তা খুঁড়ে গর্ত তৈরির ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হবে, তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অথবা পুজো কমিটিকেই নিতে হবে বলেও সতর্ক করেন বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এপিডিসিএল কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি প্রতিমা বিসর্জন পর্ব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট নাগরিক তথা আইনজীবী দুলাল মিত্র পুজোর সময় ডিজে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার এবং অতিরিক্ত শব্দের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার উপর জোর দেন। শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের মান বজায় রাখে এমন পুজো কমিটিগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি। তাঁর আরও প্রস্তাব, প্রতিমা বিসর্জনের পর একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হোক। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং শব্দ ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেওয়া পুজো কমিটিগুলিকে পুরস্কৃত করা যেতে পারে।শিলচরের বিশিষ্ট নাগরিক মৃদুল মজুমদার যান চলাচল সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। যানজট কমাতে শ্মশানঘাটের কাছে অবস্থিত রাস্তাটিকে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করার প্রস্তাব দেন তিনি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত পথবাতির ব্যবস্থা করার উপরও জোর দেন মৃদুলবাবু। এ ছাড়া রাঙ্গিরখাড়িতে মূল রাস্তার উপর গর্ত খোঁড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শহরের রাস্তায় অবাধে গবাদি পশুর চলাচলের ফলে যে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, সে দিকেও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। প্রতিমাবাহী ট্রাকের চলাচল সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট কাজের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে ডাকবাংলো তেমাথার মোড়ে পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিসর্জন পর্ব সম্পন্ন করার উপরও জোর দেন নিত্যভূষণবাবু।বৈঠকে তৈমুর রাজা চৌধুরী আলোচনার কার্যবিবরণী বাংলায় প্রস্তুত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নাগরিকদের ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও ঐক্যের মনোভাব নিয়ে দুর্গাপুজো উদ্যাপনের আবেদন জানান তিনি। মালুগ্রাম ও ঘনিয়ালা এলাকার লোকনির্মান সড়ক বিভাগের রাস্তা মেরামতির কাজে বিলম্ব হওয়া নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তৈমুর রাজা চৌধুরী। কাছাড়ের সহকারী আয়ুক্ত মাসি টোপনো জানান, ডিজে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং শব্দদূষণ রোধের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। তিনি আরও জানান, গত পাঁচ বছরের তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওই তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। বৈঠকে আগামী ২১ ও ২২ অক্টোবর দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। কাছাড়ের জেলাশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দু’দিনের মধ্যেই বিসর্জন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে।বিসর্জন উপলক্ষে সদরঘাটে বিনামূল্যে পাঁচ ট্রাক বালি, পাঁচ ট্রাক পাথরের খোয়া, ক্রাশার ডাস্ট এবং লাল মাটি সরবরাহ করবে কাছাড়ের বন বিভাগ। প্রতিমা বিসর্জনের জন্য একটি মোটরবোট এবং উদ্ধারকাজের জন্য একটি লঞ্চের ব্যবস্থা করবেন অভ্যন্তরীণ জল পরিবহণ দফতরের কার্যনির্বাহী বাস্তুকার। বিসর্জন অনুষ্ঠানের আগে জলযানগুলির যথাযথ অবস্থান ও স্থাপনা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিলচর পুরনিগমের সহকারী কার্যনির্বাহী বাস্তুকারকে। উৎসবের দিনগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিসর্জনের যাবতীয় ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে এপিডিসিএল কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। বিসর্জনঘাটে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে কাছাড়ের পুলিশ সুপারকে পুলিশকর্মী মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখবেন সদর রাজস্ব চক্রের চক্র আধিকারিক। বিসর্জন প্রক্রিয়া চলাকালীন ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েনের ব্যবস্থা করবে ম্যাজিস্ট্রেসি শাখা। সদরঘাটে উদ্ধারকারী নৌকাসহ এনডিআরএফ ও এসডিআরএফের দল মোতায়েনের বিষয়টি সমন্বয় করবে কাছাড় জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ। দু’দিনের বিসর্জন পর্বে পালা করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে মেডিক্যাল টিমের ব্যবস্থা করবেন স্বাস্থ্য পরিষেবার যুগ্ম সঞ্চালক। পুজোর দিনগুলিতে যানজট কমাতে কার্যকর ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ট্র্যাফিক ইনচার্জকে।উৎসবের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা এবং বড় বড় গর্ত মেরামতির ব্যবস্থা করতে লোকনির্মান সড়ক বিভাগ ও এনএইচআইডিসিএলের কার্যনির্বাহী বাস্তুকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে, পুজোর দিনগুলিতে পর্যাপ্ত পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগ(পিএইচই), অম্রুত (AMRUT) এবং এউডব্লিউএস অ্যান্ড এসবি-র (AUWS&SB) কার্যনির্বাহী বাস্তুকারকে। প্রতিমা বিসর্জনের কাজে সহায়তার জন্য প্রতিটি পুজো কমিটিকে অন্তত ১০ জন করে শ্রমিকের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। পুজোমণ্ডপগুলিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বৈঠকে। উপযুক্ত স্থানে ডাস্টবিন বসানো, বর্জ্য যথাযথভাবে পৃথকীকরণ এবং সে সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশিকা বা সাইনবোর্ড রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পরিবেশ ও শব্দদূষণ কমানো এবং নিরাপদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিসর্জন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও পুজো কমিটিগুলিকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। সভাপতির ধন্যবাদজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে বৈঠকের সমাপ্তি ঘটে। দুর্গাপুজো ২০২৬ শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপন এবং শহরের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের যাতে অযথা ভোগান্তির মুখে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও পুজো কমিটিগুলি ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
