মোদীর বার্তা, ‘নিয়ম-গ্রহীতা’ থেকে ‘নিয়ম-নির্ধারক’ হোক গ্লোবাল সাউথ
বিশ্ব শাসনব্যবস্থার কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ব্রিকসকে এমন এক মঞ্চ হিসাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন, যা গ্লোবাল সাউথকে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রান্তিক অবস্থান থেকে সরিয়ে বিশ্ব-নীতির নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।
শনিবার নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব শাসনব্যবস্থা ও বহুপাক্ষিকতার শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করে মোদী বলেন, বিশ্বব্যাপী সঙ্কটের সবচেয়ে বেশি অভিঘাত যাঁদের উপর পড়ছে, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদেরই ভূমিকা এখনও তুলনামূলক ভাবে কম।
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, গ্লোবাল সাউথ “বিশ্বব্যাপী সঙ্কটের একেবারে সামনের সারিতে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পিছনের সারিতে”। এই পরিস্থিতির বদল ঘটিয়ে বিদ্যমান “সুবিধাভোগের পিরামিড”কে “অংশীদারিত্বের মঞ্চে” পরিণত করার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন যাতে বিশ্ব শাসনব্যবস্থায় ঘটে, সে জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে সওয়াল করেন মোদী। বিশেষ করে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথকে ‘নিয়ম-গ্রহীতা’ থেকে ‘নিয়ম-নির্ধারক’ করে তুলতে ব্রিকসের মাধ্যমে উদ্যোগী হওয়ার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, গ্লোবাল সাউথের তরুণ কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনার দক্ষতা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং আইনি জ্ঞান দিয়ে তৈরি করতে হবে, যাতে তাঁরা অন্যত্র তৈরি নিয়ম শুধু মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সেই নিয়ম তৈরিতেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারেন।
বিশ্ব বাণিজ্য সচল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী নাবিকদের সমস্যার কথাও তুলে ধরেন মোদী। সঙ্কটের সময়ে তাঁদের পর্যাপ্ত সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না বলে উল্লেখ করে তিনি ‘Seafarers Emergency Support Network’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবির মধ্যে ব্রিকস যে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির স্বার্থ তুলে ধরার আরও শক্তিশালী মঞ্চ হয়ে উঠতে চাইছে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সেই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ।
শীর্ষ সম্মেলনের শেষে গৃহীত নয়াদিল্লি ব্রিকস নেতাদের ঘোষণাপত্রে বহুপাক্ষিকতাকে শক্তিশালী করা এবং বিশ্ব শাসনব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পক্ষেও সওয়াল করেছে ব্রিকস।
ঘোষণাপত্রে বিশ্ব শাসনব্যবস্থার সংস্কার, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা, টেকসই উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা-সহ একাধিক ক্ষেত্রে ব্রিকসের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে মোদীর বার্তা শুধু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আহ্বানে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি বাস্তব প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা অর্জনের উপরও জোর দেন তিনি। সমাপ্তি বক্তব্যে তাঁর বার্তা, ভবিষ্যৎ যদি সকলের অভিন্ন হয়, তবে সেই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অধিকারও সকলের মধ্যে ভাগ করে নিতে হবে। তাঁর কথায়, “কণ্ঠস্বর থেকে প্রভাবের দিকে, বিশেষাধিকার থেকে অংশীদারিত্বের দিকে।”
অধিবেশনের সমাপ্তি এবং নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে ব্রিকস তার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান নির্ধারণে গ্লোবাল সাউথের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রতিষ্ঠার পথে এগোল।
