দেশ গড়ার স্বপ্ন পূরনে গণদীক্ষা
সবকিছু চাই রাতারাতি। শর্টকাটের সন্ধানে সবাই। দেশ পাল্টাবো, সমাজ পাল্টাবো, – রাতারাতি। স্বপ্ন দেখি,- আসবেন এমন একজন নেতা যার থাকবে অদ্ভুত ক্ষমতা। অদ্ভুত ক্ষমতাবলে তিনি আমার দেশটাকে পাল্টে বানিয়ে দেবেন স্বর্গ! এমন প্রকল্প বানাবেন তিনি ,- দেশে আর থাকবে না কোন গরীব। সব বেকার চাকরী পাবে, -সুন্দরী বউ বিয়ে করবে , -দামী বাইক আর সোনার চেন পণ নিয়ে- সুখে সংসার করবে। এমন আইন চালু করবেন ,- দেশে আর হবে না কোন চুরি-ডাকাতি-ধর্ষন-কালোবাজারি- দূর্নীতি। আমরা সবাই থাকব আমাদের মতই,- কিন্তু দেশটা যাবে পালটে!! অদ্ভুত এক ভ্রমে আটকে পড়ে আমরা সবাই। আর, এই ভ্রমে পড়েই,- নেতার পর নেতা পাল্টাচ্ছি, -তাদের উপর আকাশছোঁয়া আশা করছি। মন্ত্রীরা ও জনগনের আশার পূরন করতে গিয়ে রাতারাতি গরীবদের ধনী বানানোর উদ্দেশ্যে এমন কিছু প্রকল্প নিচ্ছে যা তাদের কর্মক্ষমতা ও যোগ্যতাকে নষ্ট করে চিরতরে গরীব বানিয়ে রাখছে, সরকারী দানদক্ষিনার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হচ্ছে। শর্টকাট শিক্ষার হার বাড়াতে গিয়ে প্রচুর গ্রেস মার্ক দিয়ে অযোগ্য ছাত্রছাত্রীদের পাশ করিয়ে দিয়ে তাদের চিরতরে অযোগ্য বানিয়ে রাখছে। সবার শুধু চাকরি চাই, লোন চাই, ফ্রী চাই,… শুধু চাই আর চাই। কিন্তু ভাই, শর্টকাট যে কিছুই হয়না। যেভাবে দেশটা জাহান্নামে গিয়েছে ঠিক সেইভাবেই ফেরত আসতে হবে। বিশাল বড় সুদৃশ্য অট্টালিকা গড়ার স্বপ্ন দেখছি,- শুরুটা যে করতে হবে একটা ইঁট দিয়েই। দেশ গড়ার কাজে সেই প্রথম ইঁটটা কে?? অবশ্যই আমি নিজে। আমিই সেই প্রথম ইঁট,- দেশ গড়ার কাজে যাকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি ঠিক হলে আমার পরিবার ঠিক হবে, পরিবার ঠিক হলে সমাজ ঠিক হবে, সমাজ থেকে দেশ। আকাশকুসুম কল্পনায় কিছু হবেনা। একটু একা বসে চুপচাপ ভাবতে হবে। দেশের- সমাজের প্রকৃত সমস্যা ও অভাব কি? বেকারত্ব, জনসংখ্যা বিস্ফোরন, আর্থিক মন্দা,গরিবী, অশিক্ষা, প্লাস্টিক, – এগুলিই কি দেশের প্রকৃত সমস্যা?? আরেকটু গভীরে গেলে দেখতে পাব,- দেশে প্রকৃত মানুষের খুব অভাব। স্কুল বাড়ছে, কলেজ বাড়ছে, ডিগ্রী বাড়ছে, আইন-আদালত-থানা-পুলিশ-জেল বাড়ছে, টাকা-আরাম-আয়েস বাড়ছে, বিজ্ঞান এগোচ্ছে, চাঁদে যাচ্ছি,- কিন্তু-মানুষের ‘ মান’ ও ‘ হুস’ কমছে। যোগ্যতা কমছে, দায়ীত্ববোধ কমছে, শ্রদ্ধা-বিশ্বাস-ভালবাসা কমছে, পারস্পরিকতা কমছে, মানবিকতা ও সাহস কমছে, বোধ কমছে, কর্মপ্রবনতা কমছে, আদর্শ কমেছে, ‘মানুষ’ কমছে। বিশাল বড় ডিগ্রী নিয়ে বড় অফিসার হয়ে আমরা ঘুস খাচ্ছি, বড় ডাক্তার হয়ে রোগীকে ব্যাবসার রসদ ভাবছি, বড় মন্ত্রী হয়ে কয়েকশ টাকার ঘোটালা করছি, প্রতিনিয়ত মিথ্যা বলছি, ব্যাভিচারে লিপ্ত হচ্ছি, চুরি করছি,ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছি, অফিসের দেয়ালে পানের ফিক ফেলছি, মা-বাবাকে সংসারের বোঝা ভাবছি – আর ভাবছি,- আমার দেশটা বদলে যাবে!! দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে কিছুদিন থেকে যখন চলে আসছিলেন,- শ্রীশ্রীঠাকুর তাকে অনুরোধ করেন আরো কিছুদিন থেকে যাওয়ার জন্য। কিন্তু দেশবন্ধু বলেন,-” ঠাকুর, আপনার এখানে থাকতে পারলেই আমার ভাল লাগে। কিন্তু আমার স্বরাজ দলটার দায়ীত্ব যে কারো উপর ছেড়ে কিছুদিন নিশ্চিন্তে আপনার কাছে থাকব,- সে উপায় নেই।” ঠাকুর সেদিন প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন,-” দাসদা, আপনার একটা ছোট্ট স্বরাজ দলের দায়িত্ব দেওয়ার লোক পান না!! দেশ স্বাধীন করে কার হাতে দেবেন?” আজকে শ্রীশ্রীঠাকুরের আশংকাই সত্যি হচ্ছে। দেশে লোকের খুব অভাব। যোগ্যতার খুব অভাব। তাই আকাশ কুসুম কল্পনা না করে,- শুরু করতে হবে আমার নিজের থেকেই। নিজেকে বদলাতে হবে, শুধরাতে হবে, নতুন করে গড়তে হবে। কিভাবে শুধরাব নিজেকে,? নিজের ত্রুটিগুলি কিভাবে ধরব? আমার মূখের কোন দাগ, কোন ময়লা পরিস্কার করতে হলে প্রয়োজন একটি আয়নার। সেই আয়নায় নিজের চেহারার ময়লা-দাগ দেখে আমি তা পরিস্কারে ব্রতী হই। কিন্তু আমার স্বভাবের-চরিত্রের ময়লা ধরা পড়বে কিভাবে। প্রয়োজন সেই আয়নারূপ জীবন্ত আদর্শের,- যাঁকে ভালবেসে আমি তাঁকে অনুসরণ করব। তাঁকে খুশী করাই হবে আমার জীবনচলনার উদ্দেশ্য,- আর তখনই আমার স্বভাবের-চরিত্রের ময়লাগুলি ধরা পড়বে। সদগুরুই পারেন আমার ভিতরের অপ্রকাশিত সম্ভাবনাগুলি প্রকাশিত করে আমার জীবনকে আরো উন্নত করে তুলতে।বানরশ্রেষ্ঠ হনুমান গভীর পান্ডিত্য ও অসীম ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ,- বনে জংগলে ঘুরে বেড়াত। সে তার গুন সম্পর্কে নিজে অবগত ছিলনা। তাঁর জীবন ছিল উদ্দেশ্যহীন যতক্ষন সে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সাক্ষাত পায় নি। কিন্তু ভগবান শ্রীশ্রীরামচন্দ্রের প্রতি তাঁর গভীর প্রেম ও বিশ্বাস তাঁকে অমর করে রেখেছে। শ্রীশ্রীরামচন্দ্রকে খুশী করতে গিয়েই সে এমন এমন অসম্ভব কান্ড ঘটিয়েছে,- যার সম্পর্কে তার পূর্বে কোন ধারনাই ছিল না। শ্রীরামচন্দ্রের প্রেমের যাদুতে বানরশ্রেষ্ঠ হনুমান পরিনত হলেন ভক্তশ্রেষ্ঠ মহাবলী হনুমানে। তেমনি আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই প্রয়োজন শ্রীশ্রীরামচন্দ্রের মত এমন এক জীবন্ত আদর্শ,- যিনি আমাকে জীবনের পথ দেখাবেন, ভালবাসবেন, শাসন করবেন, শুধরে দেবেন। আর, এই জীবন্ত আদর্শকে গ্রহন করার প্রাথমিক পদক্ষেপই হল দীক্ষা,- দক্ষতা অর্জনের শুভারম্ভ।তাই গনদীক্ষা ও দীক্ষান্তে সঠিক অনুশীলনই পারে দেশ বদলাতে। নতুবা, তেল মাখা পিচ্ছিল বাঁশ বেয়ে উপরে উঠার মতই হবে দেশের অগ্রগতি!